সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড

প্রকাশিত: ২৭-০৯-২০১৮, সময়: ১১:১৬ |
খবর > মতামত
Share This

মামুন অর রশিদ : মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সে আন্দোলনে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলো এবং ছিনিয়ে এনেছিল কাঙ্খিত স্বাধীনতা।

১৯৭১ সালে সেপ্টেম্বর মাসের এ সময়টিতে মুক্তিযুদ্ধ শাণিত অস্ত্রের মত প্রবহমান হচ্ছিল। একদিকে পাকবাহিনীর দ্বারা যেমন গণহত্যা, ধর্ষন, লুণ্ঠন চলছে অন্যদিকে পাকবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য এ দেশের দেশপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধারা নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করছেন। জীবন বাঁচাতে সাধারণ মানুষ বনে জঙ্গলে জনমানবহীন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে ভারত মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বে এক বিরল নজির স্থাপন করেছিল এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে তারা আশ্রয় দিয়েছিল। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে ১১ টি সেক্টর গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নারীপুরুষ সমানভাবে কাজ করেছেন।

দেশের মধ্যেও মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশের নেতারা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য কাজ করছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে যা ঘটছে তা প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া এর ভয়াবহতা কারর পক্ষে উপলদ্ধি করা সম্ভব ছিলো না। বিশ্ব গণমাধ্যমের কর্মীরা সংবাদ সংগ্রহ করছেন এবং তা প্রচার করছেন। সাংবাদিক ছাড়াও কবি সাহিত্যিক ডাক্তাররা এসেছিলেন এ সংকটময় সময়ে।

মানবতাবাদী মার্কিন কবি ও গীতিকার আরউইন অ্যালেন গিন্সবার্গ বিশ্বগণমাধ্যম দেখে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাকান্ড ও শরণার্থীদের স্বচক্ষে দেখার জন্য এদেশে চলে আসেন। মানবতার মূর্ত প্রতীক শুধু বাংলাদেশ নিয়ে নয়, আরও কয়েকটি দেশের যুদ্ধরত অবস্থা দেখে নানা ধরনের লেখালেখি করেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শরণার্থীদের দেখা এবং তাদের আর্থিকভাবে সাহায্য নিয়ে ভারতের পশ্চিমবাংলার কবি ও সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তে শরণার্থীদের দুর্দশা দেখার জন্য শরণার্থী ক্যাম্পে চলে আসেন। যশোর রোড মূলত বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার জন্য একটি সড়ক।

দঅ্যালেন গিন্সবার্গের বর্ণনামতে তিনি রাস্তার ধারে শরণার্থীদের চরম দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সে সময় বন্যা ও প্রবল বৃষ্টিপাতের কারনে যশোর রোড প্রায় পানিতে ডুবে গিয়েছিল। অ্যালেন গিন্সবার্গ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে নৌকায় করে বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত পৌছেন। শরণার্থীরা খাবার বা ত্রাণের সন্ধান পেলেই ছুটে যায় এবং সংগ্রাম করে খাবার ছিনিয়ে নেওয়া, মরা লাশ,ডায়রিয়া আক্রান্ত মরণযন্ত্রনায় কাতর মানুষের আর্তনাদ। ধর্ষিতা নারীর উদাসীন মন ও সম্ভ্রম হারানোর বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকা, অভিভাবকহীন সন্তানের দুর্বিষহ জীবন যাপন দেখেছেন। তিনি তার কবিতায় লিখেছেন”

সময় চলেছে রাজপথ ধরে যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল, সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, গরুগাড়ি কাদা রাস্তা পিছিল লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে, লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়, ঘরহীন ভাসে শত শত লোক লক্ষ জননী পাগলের প্রায়। রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু, পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে এইটুকু শিশু এতবড় চোখ দিশেহারা মা কারকাছে ছোটে। সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, এত এত শুধু মানুষের মুখ, যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন ফসলের মাঠ ফেলে আসা সুখ। কারকাছে বলি ভাতরূটি কথা, কাকে বলি করো, করো করো ত্রাণ, কাকে বলি, ওগো মৃত্যু থামাও, মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রান। কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা, জননীর কোলে আধপেটা শিশু একেমন বাঁচা, বেঁচে মরে থাকা। ছোটো ছোটো তুমি মানুষের দল, তোমার ঘরেও মৃত্যুর ছায়া গুলিতে ছিন্ন দেহ মন মাটি, ঘর ছেড়ে ছোতো মাটি মিছে মায়া। সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, ঘর ভেঙে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে, যশোর রোডের দুধারে মানুষ এত এত লোক শুধু কেনো মরে”।

তিনি দেশে ফিরে টানা তিনদিন ধরে ১৫২ লাইনের এতিহাসিক এবং সাড়া জাগানো কবিতা “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” রচনা করেন। দীর্ঘ এ কবিতাটি “দ্য নিউইয়র্ক টাইমস” এ প্রকাশিত হলে বিশ্ব সম্প্রদায় পাকিস্তানকে ধিক্কার জানাতে থাকে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে। পরবর্তীতে গিন্সবার্গের বন্ধু গায়ক জন লেননের কাছে কবিতা পাঠ করে শোনালে লেনন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন এবং কবিতাকে গানে রূপ দিতে সহায়তা করেন।অন্যদিকে বিখ্যাত মার্কিন গায়ক বব ডিলান ছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গের বন্ধু। তিনি অন্যান্য গায়কদের নিয়ে যুদ্ধাহত মানুষের আর্থিক সাহায্যের জন্য “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ” আয়োজন করে। গিন্সবার্গ তার লেখা গেয়ছিলেন এবং গিটারে বব ডিলান ছিলেন। এ গানের মাধ্যমে বর্বতার চিত্র তুলে ধরলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে উঠে। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রচুর আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল। এ ঋণ বাঙালি কোনদিনই ভুলবেনা। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে তাকে “মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা” প্রদান করা হয়। শুধু সম্মাননা দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেলেও তার অমর কবিতাটি আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সংযুক্ত করতে পারিনি। মানুষ তাকে গভীর শ্রদ্ধাভরে এবং ভালোবাসায়। অন্যদিকে “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” আমাদের নিয়ে যায় সেই একাত্তরে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a comment

আরও খবর

  • দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সত্যায়ন
  • সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড
  • বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক বন্ধন ও আজকের বাঙালির জন্য পথনির্দেশ
  • ‘মেসে থাকি তো একটু সাশ্রয়ী হতেই হয়’
  • হৃদয়বিদারক শোকের দিন আজ
  • প্রিয় দেশবাসী…
  • বামরা শ্রমিক স্বার্থের কথা বলছে না কেন?
  • বন্ধুত্ব স্বার্থহীন ভালোবাসার এক সুদৃঢ় বন্ধন
  • অভিনন্দন নবনির্বাচিত নগর পিতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন
  • সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আবু রায়হান এক তরুণ কিংবদন্তী
  • ‘জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করলে দেশ উন্নত হবে’
  • একজন নিজ জনপদ প্রেমিক ও উন্নয়নবিদ
  • প্রসঙ্গ কোটা সংস্কার আন্দোলন
  • খায়রুজ্জামান লিটন শুধু নেতা নয়, একজন চেইঞ্জ মেকার
  • প্রেরণা ও আস্থার ধ্রুবলোক তুমি


  • উপরে