‘মহান মে দিবস’

‘মহান মে দিবস’

প্রকাশিত: ০১-০৫-২০১৮, সময়: ১১:৩২ |
খবর > মতামত
Share This

মনিরুজ্জামান শেখ রাহুল : আজ পহেলা মে “আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস”। সারা বিশ্বে দিবসটি ‘মহান মে দিবস’ নামেও পরিচিত। এই দিনটি বিশ্বের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন। দিনটি মেহনতি মানুষের বিজয় ও আনন্দ উৎসবের দিন। ঘর্ম¯্নানে পরিনত হওয়া মানুষদের চিত্র ভেসে উঠে আজকের এই দিনে। এই দিনটি শ্রমিকদের নিকট অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যের দিন। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে তাদের নায্য অধিকার আদায়ের দিন।

উনিশ শতকের দিকে মালিকশ্রেণী শ্রমিকদের শ্রম কিনে নিত। দিনে ১০-১২ ঘন্টা পরিশ্রম করে বিনিময়ে তারা পেত খুবই স্বল্প মজুরি। এছাড়াও মালিকেরা শ্রমিকদের সাথে পশুসূলভ ব্যবহার করতেন। তাদের এই স্বল্প মজুরিতে পরিবারের ভরণপোষণও সম্ভব হত না। তাই ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর আমেরিকার ‘ফেডারেশন অব লেবার’ মালিকশ্রেনীর কাছে ৮ ঘন্টার কাজ করার দাবি উত্থাপন করে। কিন্তু তাতেও মালিকশ্রেণী রাজি হয় না। বরং শ্রমিকদের উপর তাদের অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

অতঃপর ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শিল্প শ্রমিকেরা ধর্মঘটের ডাক দেন। তাদের ডাকে সেখানে এসে হাজির হয় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। কারখানা ত্যাগ করে শ্রমিকেরা উপস্থিত হয় রাজপথে। রাজপথও হয়ে উঠেছিল সংগ্রামী। শ্রমিকদের সীমাহিন কষ্ট ও আর্তনাদ লুকিয়ে বলিষ্ঠভাবে তাদের নায্য অধিকার আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। কেননা তাদের উপর যে অত্যাচার ও নির্যাতন চলছিল তা ছিল তাদের নিকট অসহনীয়। প্রতিদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে তারা যেন যন্ত্রমানবে পরিনত হয়ে গেছিল। তাদের দুঃখ ও কষ্ট বোঝার মত মালিকশ্রেনীর তেমন কেউই ছিল না। তারা সবসময়ই তাদের মালিকের হুকুমের দাসদাসী হয়ে থাকতেন। তাদের উপর প্রতিনিয়ত চলত অমানবিক নির্যাতন। দীর্ঘদিন চলতে থাকা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় সকল মেহনতি মানুষেরা। তাদের পাপ্যতা আদায়ে মূলত তারা আজকের এই দিনে নেমে আসে আন্দোলনে। তৎকালিন হে মার্কেটের চারপাশে যেন শ্রমিকদের কান্না, দুঃখ ও কষ্টে জর্জরিত সকল শ্রমিকদের অসহায়ত্বের ছাপ পড়েছিল। তাদের দৈনিক কাজের সময় ও মালিকের এই পশুর ন্যায় আচরন থেকে রক্ষার জন্য সকল শ্রমিক এই সংগ্রামে নেমে পড়ে। এই আন্দোলনে পুলিশ তাদেরকে কঠোরভাবে দমন করার চেষ্টা করে। ৩ মে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে আবারো একই স্থানে আমেরিকার বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক এসে উপস্থিত হয়। সেই শ্রমিক সমাবেশে বক্তব্য রেখেছিলেন শ্রমিক নেতা অগাস্ট স্পীজ। এ সময়ই মালিকশ্রেণীর পাঠানো এক দুর্বৃত্ত সেখানে বোমা বিস্ফোরন করে। সেখানে উপস্থিত একজন পুলিশ মারা যায়। এত পুলিশ ক্ষুদ্ধ হয়ে নিরীহ শ্রমিকদের উপর উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এতে সেখানে এগারো জন শ্রমিক নিহত হয়। এরপরও মালিকশ্রেণী শ্রমিকদের নায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়। ধর্মঘট করার অপরাধে অগাস্ট স্পীজ সহ ৮ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়। ১৮৮৭ সালে সেই মিথ্যা মামলার রায় ঘোষিত হয়। ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ছয় জন শ্রমিকের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে অগাস্ট স্পীজ বলেছিলেন, “আজ আমার এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে।” ১৮৯৩ সালের ২৬ জুন ইলিয়নের গভর্নর অভিযুক্ত ৮ জনকেই নির্দোষ বলে ঘোষণা করেন এবং সেই হুকুম প্রদানকারী পুলিশ কমান্ডারকে অভিযুক্ত করেন দুর্নীতির দায়ে। লুইস কিং নামের এক শ্রমিক নেতা তার ফাঁসির আগের দিনই কারাঅভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন ও আরেকজনের ১৫ বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয়। তবুও শ্রমিক আন্দোলন থেমে থাকে নি। শিকাগো শহরের ভয়াবহ ঘটনার সংবাদ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এই শ্রমিক আন্দোলন আস্তে আস্তে বড় আকারে রুপ নেয়। নায্য অধিকার আদায়ে তাদের আন্দোলন আরো বৃহৎ আকারে সঞ্চালিত হয়। অবশেষে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। অত:পর ১৮৯০ সালের ১ মে থেকে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরিশেষে বিজয় হয় শ্রমিক আন্দোলনের ও ইতিহাসের পাতায় এক স্মরনীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়। জাতিসংঘের একটি শাখা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আই.এল.ও) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিকদের নায্য অধিকার সমূহ স্বীকৃতি পায় ও বিশ্বের প্রতিটি দেশের মালিক ও শ্রমিকদের তা অনুসরন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশও আই.এল.ও এর সদস্যসমূহের মধ্যে একটি দেশ। এ দেশে ১ মে সরকারী ছুটি হিসাবে পালন করা হয়। এদেশে সরকারী কর্মস্থলে আই.এল.ও এর সকল নীতিমালা অনুসরন করা হয়। এদেশেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেহনতি মানুষের পক্ষে আন্দোলন করে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, “বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত শাসক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে।” তিনি সবসময় মেহনতি মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আন্দোলন করে গেছেন। প্রতিবছরের মত এই বছরও অনেক আনন্দের সাথে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস।

আরও খবর

  • দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সত্যায়ন
  • সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড
  • বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক বন্ধন ও আজকের বাঙালির জন্য পথনির্দেশ
  • ‘মেসে থাকি তো একটু সাশ্রয়ী হতেই হয়’
  • হৃদয়বিদারক শোকের দিন আজ
  • প্রিয় দেশবাসী…
  • বামরা শ্রমিক স্বার্থের কথা বলছে না কেন?
  • বন্ধুত্ব স্বার্থহীন ভালোবাসার এক সুদৃঢ় বন্ধন
  • অভিনন্দন নবনির্বাচিত নগর পিতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন
  • সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আবু রায়হান এক তরুণ কিংবদন্তী
  • ‘জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করলে দেশ উন্নত হবে’
  • একজন নিজ জনপদ প্রেমিক ও উন্নয়নবিদ
  • প্রসঙ্গ কোটা সংস্কার আন্দোলন
  • খায়রুজ্জামান লিটন শুধু নেতা নয়, একজন চেইঞ্জ মেকার
  • প্রেরণা ও আস্থার ধ্রুবলোক তুমি


  • উপরে