ড. জ্জোহা রাবির নাকি বাংলাদেশের সম্পদ?

ড. জ্জোহা রাবির নাকি বাংলাদেশের সম্পদ?

প্রকাশিত: ১৮-০২-২০১৮, সময়: ১০:০৬ |
Share This

হুসাইন মিঠু : আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি। পঞ্জিকার পাতায় হয়তো অন্যান্য দিনের মতোই একটি দিন। কিন্তু ১৯৬৯ এই দিনে শহীদ অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহার বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো মতিহারের সবুজ চত্ত্বর। সেই রক্তেরাঙা দিনটিতে আসলে কী ঘটেছিলো?

১৯৬৯ সালের গন-অভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের আন্দোলনের কর্মসূচীর ঘোষণায় পাক-বাহিনী ১৪৪ ধারা জারী করে। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারী সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এ ধারা উপেক্ষা করে মেইন গেটের সামনের মহাসড়কে পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে। খবর পেয়ে প্রক্টর ড. জ্জোহা মেইন গেইটে ছুটে যান। প্রক্টর হিসেবে তিনি ছাত্রদের শান্ত করার এবং ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ছাত্ররা পিছু হঠতে না চাইলে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন হাদী ছাত্রদের গুলি করার নির্দেশ দেয়। তখন ড. জ্জোহা পাক বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে’। ড. জোহা ডন্ট ফায়ার! ডন্ট ফায়ার! বলে চিৎকার করতে থাকেন। তিনি ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। কিন্তু প্রক্টরের আশ্বাসে কোন কর্ণপাত না করে বেলা ১১টার সময় ক্যাপ্টেন হাদী তার পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলি করার সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলনের মহান নেতা। বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মতিহারের নিষ্পাপ সবুজ চত্ত্বর। হাসপাতাল নেয়ার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে চলে গেলেন তিনি না ফেরার দেশে।

‘কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে’ এমন দুঃসাহসিক কথা ড. জ্জোহা ছাড়া আর কার মুখেই বা শোভা পায়। বুক চিতিয়ে দিয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর চিন্তাই বা করে কয়জন শিক্ষক? তিনি করেছিলেন। নিজের জীবন দিয়ে প্রমান করেছিলেন শিক্ষকতা পেশা একটি মহান দায়িত্ব। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর এতো বছর পরও যোগ্য সম্মানটুকু দেয়া হয়নি। জাতীয় আন্দোলনে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করলেও এখনো তাঁর বীরত্বগাথার ইতিহাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ।

এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম রাবির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেমের কাছে। প্রবীন এই ইতিহাসবিদ আক্ষেপ করে বললেন, ড. জ্জোহাকে শুধুমাত্র রাবির অধ্যাপক ভাবলে ভুল হবে। গোটা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। শুধুমাত্র রাবির গণ্ডিতেই বছরে একবার জোহা দিবস পালন করায় কোন মাহাত্ম্য দেখছি না। তিনি এমন একজন শিক্ষক যিনি শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়েছিলেন।

আজ থেকে ৪৯ বছর আগের সেই দিনটি আজও অম্লান। পিতা যেমন তার সন্তানকে আগলে রাখে ঠিক তেমনি জ্জোহা স্যার নিজের জীবন দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সকল ছাত্রের জীবন। শিক্ষকদের ইতিহাসে যিনি আত্নত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার শাহাদাদের ফলেই তৎকালীন পূর্ব পকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতার ধারা উন্মুক্ত হয়। তার এই শাহাদাতের দিনটাকে স্বরণ রাখতে নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় রাবি শিক্ষক দিবস হিসেবে। যদিও জাতীয়ভাবে শিক্ষক দিবস পালন দীর্ঘদিনের দাবি রাবি পরিবারের ।

জানতে চাইলে ড. কাসেম আরো বলছিলেন, সেই সময় অপারেশন থিয়েটারে থাকা ড. দিলীপ বলেছিলেন, ড. জ্জোহাকে গুলি করেই নয় বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ থেকেই বুঝা যায় তাকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়েছিল। এজন্য তাকে জ্জোহা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া ও ঘটনাটিকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, রাজশাহী প্রান্তিক অঞ্চলে হওয়ায় বিষয়টি আজও জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি, এটা আমাদের হীনমন্যতার পরিচয়।

ড. শামসুজ্জোহা ১৯৩৪ সালে পশ্চিম বঙ্গের বাঁকুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালের পর ড. জোহার পরিবার স্থায়ীভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে চলে আসেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্থান অর্ডিন্যান্স কারখানায় সহকারী কারখানা পরিচালক পদে শিক্ষানবীশ হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। এরপর ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। ড. জোহা বিভিন্ন গবেষণা কর্মের সাথেও জাড়িত ছিলেন। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন জার্নালে তার বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।

ড. জোহার স্মৃতিকে ধরে রাখতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্র হলের নামকরন করা হয়েছে। মেইন গেটে গুলিবিদ্ধ হওয়া তার স্থানটিতে নির্মান করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক এবং মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশ করলে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থিত শহীদ জোহার মাজার।

১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এই দিনটি ভূলতে পারিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্র তথা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মহল। প্রতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারী রাবিতে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ড. জোহার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য পাঠ্যপুস্তকে তার আত্মদানের কাহিনী অন্তর্ভূক্ত করা এবং জাতীয় ভাবে দিবসটি উদযাপন করার দাবি ওঠে প্রতিবছরের ১৮ই ফেব্রুয়ারি। সময়ের সাথে সাথে আবার মিলিয়ে যায়।

এ বিষয়ে রাবির জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক প্রভাষ কুমার কর্মকার বলেন, দিবসটিকে জাতীয়করন এখন সময়ের দাবি। সবসময় আমরা এবিষয়ে সরকারকে অবগত করে আসছি। অন্যান্য কর্মসূচি পালনের সাথে সাথে এবারও আমরা সরকারের কাছে এই দাবি জানাবো।

লেখক- সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও খবর

  • ‘মেসে থাকি তো একটু সাশ্রয়ী হতেই হয়’
  • হৃদয়বিদারক শোকের দিন আজ
  • প্রিয় দেশবাসী…
  • বামরা শ্রমিক স্বার্থের কথা বলছে না কেন?
  • বন্ধুত্ব স্বার্থহীন ভালোবাসার এক সুদৃঢ় বন্ধন
  • অভিনন্দন নবনির্বাচিত নগর পিতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন
  • সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আবু রায়হান এক তরুণ কিংবদন্তী
  • ‘জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করলে দেশ উন্নত হবে’
  • একজন নিজ জনপদ প্রেমিক ও উন্নয়নবিদ
  • প্রসঙ্গ কোটা সংস্কার আন্দোলন
  • খায়রুজ্জামান লিটন শুধু নেতা নয়, একজন চেইঞ্জ মেকার
  • প্রেরণা ও আস্থার ধ্রুবলোক তুমি
  • হেরেও ছেলেরা এসি বাসে, জিতেও মেয়েরা লোকালে
  • পুরো লেখাটা পড়ুন
  • চল ফিরি উন্নয়নে : প্রসঙ্গ রাজশাহী মহানগর


  • উপরে