প্রেক্ষিত: ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন

প্রেক্ষিত: ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন

প্রকাশিত: ১২-০১-২০১৮, সময়: ২০:১১ |
খবর > মতামত
Share This

জালাল উদ্দিন উজ্জল : বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ বিপর্যয় এবং এর নানা বিধ বিরূপ প্রভাবের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এই লক্ষ্যে জাতীয় কৃষিনীতি, জাতীয় পানি নীতি, ভূমি ব্যবহার নীতি, বননীতি, শিল্পনীতি ও অন্যান্য জাতীয় নীতিতে এবং জাতীয় প্রেক্ষিতে পরিকল্পনা, জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ইত্যাদি পরিবেশ সংরক্ষণের নীতি প্রনীত হওয়ার পর পরিবেশের উপর আইন ও একাধিক বিধিমালা জারী হয়েছে।

এমনকি গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের বিষয়টি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এই লক্ষ্যে সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ ১৮-ক এ বলা হয়েছে “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব বৈচিত্র্য, জলাভূমি বন ও বন প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন”। কিন্তু আমরা কি দেখছি কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে স্বয়ং সম্পূর্ণ কৃষি প্রধান বাগমারা উপজেলায়? যেখানে কতিপয় বিত্তবান প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ তারা তাদের স্থানীয় প্রভাব ও পেশী শক্তির মাধ্যমে উর্বর আবাদী কৃষি জমি ধ্বংস করে অকৃষি কাজে ব্যবহার করছে।

যেমন- যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিত শত-শত হেক্টর আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করে অবৈধভাবে পুকুর খনন, অপরিকল্পিত ভাবে ইটভাটা স্থাপন, ইট প্রস্তুত করার জন্য কৃষি জমি কেটে ইটের কাঁচামাল হিসাবে উহার ব্যবহার। ফলে রাষ্ট্রের প্রনীত জাতীয় কৃষিনীতি ও ভূমির ব্যবহার নীতি মালা অনায়াসে লংঘিত হচ্ছে। পাশাপাশি হারাতে হচ্ছে উপজেলার বৃহৎ জনবহুল মানুষের অর্জিত মাথাপিছু আবাদী উর্বর কৃষি জমি ও কৃষির উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তার স্বয়ং সম্পূর্ণতা। কৃষি জমি সাধারণভাবে ব্যক্তি মালিকাধীন সম্পত্তি হলেও ইহার ব্যবহার সার্বিক জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্চনীয়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকই ক্ষুদ্র ও প্রান্ত্রিক। এর একটি বিরাট অংশ বর্গাচাষী। তাই ভূমির ব্যবহার এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে এর ক্ষতি না হয়। কৃষি জমি যতটুকু সম্ভব কৃষি কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জমির প্রকৃতিগত কোন পরিবর্তন আনা যাবে না। স্থানীয় প্রশাসন জাতীয় কৃষি নীতি ও ভূমি ব্যবহার নীতিমালা সম্বন্ধে সম্যক অবগত থাকা সত্বেও বাগমারা উপজেলায় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিগন আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করে ব্যাপক হারে পুকুর খননের হিড়িকে মেতেছিল। সেখানেও পূর্ববর্তী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কর্মকান্ড ছিল নানা প্রশ্নবিদ্ধ। সেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের একজন সচেতন মানুষ হিসাবে উক্ত অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ স্বপ্রনোদিত হয়ে জনস্বার্থে মহামান্য সুপ্রীমকোর্টের হাইকোট বিভাগে ৪৩৫৩/২০১৭ নং একটি রীট পিটিশন দায়ের করা হলে গত ৩-৪-২০১৭ ইং তারিখে শুনানী অন্তে মহামান্য হাইকোট বিভাগ সংশ্লিষ্ট রেসপন্ডডেন্ট এর প্রতি রুল নীশি জারী করতঃ উক্ত অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে নিয়মিত ভাবে বাগমারা উপজেলায় মোবাইল কোট পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেন। যা অদ্যবধি যথারীতিভাবে কার্যকর ও বলবৎ রয়েছে। তথাপিও বাগমারায় বিভিন্ন এলাকায় ঢিলেঢালা ভাবে উক্ত স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিগণ স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় অবৈধ পুকুর খনন কাজ করছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিকতার মাধ্যমে তা বৃদ্ধি করার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তবে এক্ষেত্রে উক্ত আদালতের আদেশ যথারীতি ভাবে প্রতি পালনে স্থানীয় প্রশাসনের অনাগ্রহের কারনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

এছাড়াও এই উপজেলার বিশাল জনগোষ্ঠির অনেক মানুষের জীবিকা বন ও বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ফলজ ও বনজ বৃক্ষাদির গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এই উপজেলায় স্থানীয় প্রভাবশালী বিত্তবান অবৈধ ইটভাটার মালিকগণ সরকারের জাতীয় বন নীতিমালা ও পরিবেশগত বিধি বিধান অমান্য করে ব্যাঙের ছাতার মত অপরিকল্পিত ভাবে ইট ভাটা স্থাপন ও পরিচালনার কারণে বনজ ও ফলজ বৃক্ষাদির ব্যাপক সংকোচ ও বিনাশ ঘটছে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এর ৮ ধারা (কতিপয় স্থানে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ করণ ও নিয়ন্ত্রণ) অমান্য করেই লাইসেন্স তো দুরের কথা পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধ প্রক্রিয়ায় বাগমারা উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা পরিচালিত হয়ে আসছে। সেখানে উক্ত আইনের বাস্তবায়ন নানাভাবে উপেক্ষিত।

সেক্ষেত্রে উপজেলায় নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের উক্ত প্রনীত আইনের বাস্তাবায়নের ক্ষেত্রে নানা অন্তরায় পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে আমরা সাধারণ মানুষ পরিবেশের ক্ষতিকারক নিয়ামক দ্বারা বিভিন্ন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এই বিষয়ে দৈনিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রপত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হলেও বাগমারায় দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগণ লাইসেন্স বিহীন অবৈধ ইট ভাটা বন্ধের কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই। এই অবস্থার প্রেক্ষিত স্বপ্রনোদিত হয়ে গত ২৬/১২/২০১৭ ইং তারিখে স্থানীয় প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট ১১ প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রতি জনস্বার্থে একটি আইনগত নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সেখানে অবগত করা হয়েছিল যে, উপজেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ও লাইসেন্স বিহীন স্থাপিত ও পরিচালিত ইট ভাটা বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। কিন্তু উক্ত আইনগত নোটিশের অনুরোধের প্রেক্ষিতে অদ্যবধি কোন পদক্ষেপ গৃহীত হয় নাই।

উক্ত আইনের বিষদ পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া এবং লাইসেন্স ব্যতিত বা আইন অমান্য করে অবৈধ প্রক্রিয়ায় কোন স্থানে কোন ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনা করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গণ উক্ত অবৈধ ইটাভাটার কার্যক্রম বন্ধে মোবাইল কোট পরিচালনা, পরিদর্শক ও নোটিশের মাধ্যমে তলব এবং অন্যান্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংগঠনের জন্য এখতিয়ার সম্পূর্ণ আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। কিন্ত উক্ত আইনগত নোটিশের মাধ্যমে অনুরোধ করা সত্বেও বাগমারায় অবৈধভাবে পরিচালিত ইটা ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনে স্থানীয় প্রশাসন এর ভূমিকা নিরব। বর্তমানে এইরূপ অবস্থা ও কারনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তার প্রতি হস্তক্ষেপ কামনায় মাননীয় জেলা প্রশাসক মহোদয়ের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

আশাকরি তিনি জেলার নির্বাহী প্রধান হিসাবে বাগমারা উপজেলায় বসবাসরত বহুল জনগোষ্ঠির জন্য কৃষির উন্নয়ন, কৃষি জমি সংরক্ষণ, আবাদি কৃষি জমি ব্যবহার নিশ্চিতকরণ সহ পরিবেশের বিপর্যয় ও ইহার নানাবিধ বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব হিসাবে বাগমারায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে পরিচালিত ইট ভাটা বন্ধে আশু কার্যকরী পদক্ষেপ নিবেন।
লেখক : মো: জালাল উদ্দিন উজ্জল, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোট।

Leave a comment

আরও খবর

  • প্রেক্ষিত: ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন
  • জনগণের মুখপত্র পদ্মাটাইমস২৪.কম
  • জিতেছি যতটা, হেরেছিও ততটা!
  • মহান বিজয় দিবস: দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের শক্তিশালী স্তম্ভ
  • সরকারী জমি দখল ও কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি
  • হাজার হ্রদের দেশে একজন বাঙ্গালী আইকন
  • পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় প্রশাসনের কড়া নজরদারী অপরিহার্য
  • পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই দেখুন কাঞ্চনজঙ্ঘা!
  • প্রসঙ্গ আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ, নবায়ন ও অনুপ্রবেশ
  • ‘বাবার জীবনী লেখার সময় বুঝলাম তিনি কেমন মেধাবী ছিলেন’
  • ইতিহাসের পাতায় জাতীয় চার নেতা উজ্জ্বল নক্ষত্র
  • ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে করণীয় কি?
  • পাবলিকের টাকাতেই চলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
  • সু চির বক্তব্য : হতাশার মাঝেও আশার আলো আছে কী?
  • গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা ॥ অজানা ইতিহাসের খোঁজে…
  • উপরে