সু চির বক্তব্য : হতাশার মাঝেও আশার আলো আছে কী?

প্রকাশিত: ২১-০৯-২০১৭, সময়: ২১:২৩ |
খবর > মতামত
Share This

ড. মোঃ হাবিবুল্লাহ্ : অবশেষে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মুখ খুলেছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সাং সু চি। এতো দীর্ঘ নিরবতার পর তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের যে প্রতিশ্রুতি মানুষ প্রত্যাশা করেছিল সে প্রত্যাশার বিন্দুমাত্রও পূরণ হয়েছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অংশ। সমাজ-রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক নিপিড়নে তারা বহু বছর থেকে শিক্ষা-স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য নাগরিক সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। আর এ ধরনের নিপিড়ন-নির্যাতনের চরম শিকার হয়েছেন তখন, যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছেন বিশ্বশান্তির তথাকথিত মডেল বলে বিবেচিত সু চি। সাড়া বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ প্রত্যাশা করেছিলেন অতীতে যাই হয়ে থাক না কেন অন্তঃত সু চির আমলে এ ধরনে ঘটনা ঘটবে না। শুধু তাই নয় এটির একটি স্থায়ী সমাধান হবে বলেও বিশ্ববাসী মনে করেছিল। কফি আনান কমিশন গঠন সে ধারণাকে বদ্ধমূল করেছিল। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশার আড়ালে যে রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনের নীল নকশা ছিল তা কে জানতো? সু চির বক্তব্যের দুদিন আগে সেনাবাহিনীর প্রধান মিন ওয়াং লেইং রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বর্মি জাতিকে ঐকবদ্ধ হওয়ার যে আহবান জানিয়েছিলেন তার আড়ালে আসলে সু চিকে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। আবার আন্তর্জাতিক বিশ্বের ক্রমাগত চাপকেও তিনি উপেক্ষা করতে পারেন নি । আর তাই তিনি এমন সুরে সংকটটি নিয়ে কথা বলেছেন যাতে সেনাবাহিনীকেও সন্তুষ্ট রাখা যায়, তেমনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে একটা আভাস দেয়া যায় যে তিনি রাখাইন রাজ্যের ব্যাপারে কতোটা উদ্বিগ্ন।

সারা বিশ্বই সু চির দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে যে দিক নির্দেশনামূলক এবং সংকট নিরসনের পরিকল্পনা থাকার কথা ছিল সে ব্যাপারে বিশ্ববাসী হতাশ হয়েছে। মিথ্যা এবং বানোয়াট বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে তিনি বাহ্যত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছেন। সু চি তার বক্তব্যে একটি বারের জন্যও রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেন নি। তাদের মুসলিম সংখ্যালঘু হিসাবে উল্লেখ করে কেন তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে সে ব্যাপারে তার অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন যেটি পুরোপুরি সত্যের অপলাপ। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য আনান কমিশন এবং সামরিক বাহিনীর বিতর্কিত কমিশনের পরস্পর বিরোধী সুপারিশ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্বের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সংগঠনও সু চির বক্তব্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখান করেছে। আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন এর নেতা নরুল ইসলামের মতে সু চির বক্তব্য সামরিক বাহিনীর বক্তব্যরই প্রতিধ্বনিমাত্র। রোহিঙ্গা ইন্টেলেকচুয়াল কমিউনিটির নেতা লা মিন্টও এমনটিই মনে করেন। সু চি বলেছেন পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাইসাপেক্ষে ১৯৯৩ সালের নীতিমালার আলোকে পর্যায়ক্রমে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেবে তার সরকার। এটিও একটি ভাঁওতাবাজির কথা। যাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি তাদের আবার যাচাই-বাছাই কিসের। তাছাড়া সু চির হয়তো সন্দেহ এই সুযোগে বাংলাদেশের নাগরিকদের মিয়ানমারে পুশ ইন করতে পারে।

অর্থাৎ তিনি যেমন মতলববাজ তেমনি বাংলাদেশকেও তেমন মতলববাজ ভাবছেন। তাঁর জানা থাকা দরকার বাংলাদেশ অতীতেও যেমন কখনো তার নাগরিকদের প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রে পুশইন করে নি এখনো তেমন করার কোনো প্রশ্নই আসে না। বরং অতীতেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অসহায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপাতে পুশইন করেছে, এখনো করছে। আসলে এ সবই বিশ্ববাসীর দৃষ্টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এবং সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করার অপকৌশলমাত্র। প্রকৃতপক্ষে সু চির বক্তব্য পুরোপুরিই বিভ্রান্তিমূলক। তাঁর বক্তব্যে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ কট্টর বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত রয়েছে। যারা রোহিঙ্গাদের জাতিসত্তাকেই স্বীকার করে না। অথচ প্রখ্যাত স্কটিশ ভূগোলবিদ ফ্রান্সিস বুকানন ১৭৭৮ সালেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে আরাকানের নেটিভ হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন। সুতরাং ঐতিহাসিক এবং নৃতাত্তিক বিবেচনায় তারা আরাকানের নাগরিক। আর এ কারণেই মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় অপরাধ সংঘটনের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক গণ-আদালতে (পারমানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল) ব্রিটেন প্রবাসী বৌদ্ধ মানবাধিকার কর্মী ড. মং জার্নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এ নিষ্ঠুরতাকে স্লো জেনোসাইড তথা মন্থর গণহত্যা হিসাবে উল্লেখ করে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ড. মং জার্নি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের অন্যতম নৃ-গোষ্ঠী হিসাবেও উল্লেখ করেন। রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসার দ্বারা গত ২৫ আগষ্টের হামলা বা এর আগের হামলার কারণে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সন্ত্রাস দমনের অংশ হিসাবে সশস্ত্র অভিযান চালিয়েছিল বলে যে ধারণা মিয়ানমার বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে তিনি তা জোড়ালোভাবে প্রত্যাখান করেন। তিনি বলেন শুধু জাতিগত পরিচয়ের কারণেই পদ্ধতিগত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। তাদের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া এবং জাতিগত নির্মুলের অভিযানের সাথে আরসা বা অন্যকোনো সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর কোনো সম্পর্ক নেই বলে ড. মং দাবি করেন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, সু চির বক্তব্য আর বাস্তবতার কোনো মিলই নেই। কারণ রাখাইনের সমস্ত রোহিঙ্গাদের উৎখাত করাই মিয়ানমারের উগ্র জাতিয়াবাদীদের একমাত্র লক্ষ্য। আর তাদের সে লক্ষ বাস্তবায়নের হাতিয়ার এখন অং সান সু চি। সামরিক বাহিনী এবং উগ্র বৌদ্ধ জাতিয়তাবাদীরা সু চির গণতান্ত্রিক ইমেজকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে রোহিঙ্গা জাতিগত নির্মুলের নীল নকশা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে সু চির ডাবল স্ট্যান্ডার্ড (গণতন্ত্রের রোল মডেল আবার জাতিগত নির্মূলের মাস্টার মাইন্ড) এক বড় ধাঁ ধাঁ। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের করণীয় কী সেটিই বড় প্রশ্ন।

মানবিকতার যে পরিচয় বাংলাদেশ দিয়েছে তাতে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে এটি সত্য কিন্তু এতে তো সংকট সমাধান সম্ভব নয়। সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশের সময়োচিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই। ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমের বরাতে কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য মানুষকে হতাশ করেছে। যেমন পররাষ্ট্র সচিব দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা হয়েছে। যদিও রয়টার্সের সাথে আলাপে প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলাপ হয় নি বলেই মন্তব্য করেছেন। আবার ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে দাবি করা হয়েছে স্বষমা স্বরাজের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত ছিল সৌজন্যমূলক। এ ধরনে তথ্য বিভ্রান্তিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ হলো রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বিশ্বশক্তিগুলোকে তার পাশে রাখা। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

আরও খবর

  • পাবলিকের টাকাতেই চলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
  • সু চির বক্তব্য : হতাশার মাঝেও আশার আলো আছে কী?
  • গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা ॥ অজানা ইতিহাসের খোঁজে…
  • রোহিঙ্গা সংকট নিরসন কোন পথে
  • দেশে সব নির্বাচনই হয়, শুধু ছাত্ররাই বঞ্চিত
  • প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফর ও আমাদের প্রত্যাশা
  • গান গেয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন রাবির ‘জর্জ হ্যারিসন’রা
  • ৭৫ এর ১৫ আগস্টের নাটোর
  • শেখ ফজিলাতুন নেছা- আমার মা
  • যুব সম্প্রদায় : বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্মাতা
  • চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে
  • হলি আর্টিজান হামলার নেপথ্য কথা ও ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ
  • মানুষের ভাল অভ্যাসগুলো অটুট থাকুক
  • পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও সচেতনতা প্রয়োজন
  • প্রসঙ্গ : শিশু গ্রেফতার
  • উপরে