রোহিঙ্গা সংকট নিরসন কোন পথে

প্রকাশিত: ১৫-০৯-২০১৭, সময়: ২৩:৫১ |
খবর > মতামত
Share This

ড. মোঃ হাবিবুল্লাহ্ : পাহাড়-পর্বত-সাগর পাড়ি দিয়ে হাজার-হাজার সহায়-সম্বলহীন রোহিঙ্গারা নিজ ভিটে-মাটি ছেড়ে শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর তাগিদে ¯্রােতের মতো বাংলাদেশে প্রবেশ করেই যাচ্ছে। বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গাদের অবিরাম আহাজারিতে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠছে, শিশু এবং নারীদের আর্তনাদে হু হু করে কাঁদছে মানবতা। শরনার্থী শিবিরগুলোতে অসহায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং খাদ্যহীন-আশ্রয়হীন অবস্থায় তাদের জীবন আজ বিপর্যয়ের চরম স্তরে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটুকু ঢেলে দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে। কথিত আধুনিক বিশ্বের কিছু মানবিক বোধসম্পন্ন রাষ্ট্রও সাধ্যমতো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাৎক্ষণিক কিছু সাহায্যে এই অসহায় মানুষদের জীবন বাঁচলেও তাদের ভূলণ্ঠিত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তা কী যথেষ্ট?
ইন্টার সেক্টর কোÑঅর্ডিনেশন গ্রুপের বরাতে রয়টার্স জানাচ্ছে এখনো পর্যন্ত ৩ লাখ ১৩ হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলাদেশে। প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই রয়েছে এখানে। আয়তন অনুপাতে অধিক জনসংখ্যার এ দেশে অনুপ্রবেশকারী এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্য এবং আবাসনের চাহিদা বাংলাদেশ বহন করবে কী করে? আমাদের জাতীয় জীবনে সমস্যার কোনো অন্ত নেই। এর সাথে যুক্ত এ সমস্যার ভয়াবহতার আশংকায় সরকারসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। এ সংকটের গ্রহণযোগ্য এবং স্থায়ী সমাধান অত্যাবশ্যক। আর এ জন্যই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক বিশ্বের গভীর মনোযোগ এবং কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা বাংলাদেশের সকল মানুষের। আর তাই বিশ্বশক্তিগুলোর নিন্দা কিংবা উদ্বিগ্নতা প্রকাশের চিরাচরিত প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনের হিং¯্র খেলা বন্ধে অর্থবহ উদ্যোগ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই । আর এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধসহ অন্য যেকোনো পদক্ষেপ কার্যকর বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই উদ্যোগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন কী সমর্থন দেবে কিংবা রাশিয়ার ভূমিকাও বা কী হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটে নি। ইতিমধ্যে বৃটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিয়ানমারকে সামরিক সহযোগিতা বন্ধের হুমকী দিয়েছে। এ হুমকীর প্রতি বৃটিশ পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্যদেরও অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে বলে গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে। অস্ট্রেলিয়া মিয়ানমারের সেনাদের জন্য যে কোটি কোটি ডলার প্রশিক্ষণের খরচ বাবদ অনুদান দেয় সরকারের প্রতি সে অনুদানও বন্ধ করার আহবান জানিয়েছে দেশটির জনগণ। অষ্ট্রেলিয়া সরকারও এ অনৈতিক এবং বর্বর কার্যক্রম বন্ধে মিয়ানমারের প্রতি আহবান জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কার্যক্রমে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং মিয়ানমার সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের সাথে মানবিক আচরণের আহবান জানিয়েছে। ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ রাজপথে প্রতিবাদ জানিয়েছে কিন্তু সরকারের তরফ থেকে এখনো সে ধরনের কোনো প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যায় নি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা এবং মানবাধিকার কর্মীরাও তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের এ জঘন্য কার্যক্রমকে বন্ধ করার আহবান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের প্রধান জেইদ রাদ আল হুসেন মিয়ানমারের প্রতি জাতিগত নির্মূল করার সামরিক অভিজান বন্ধের আহবান জানিয়েছেন (আলোকিত বাংলাদেশ, ১২.০৯.২০১৭)। মুসলিম ভাতৃত্বের প্ল্যাট ফরম হিসাবে বিবেচিত ওআইসি এবং আরব লীগও মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে এ ধরনের বর্বোরোচিত আচরণ বন্ধের আহবান জানিয়েছে তবে তা কতোটুকু জোরালো তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কাজাকাস্তানের রাজধানী আস্তানায় ওআইসির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রথম সম্মেলনে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ হামিদের অংশগ্রহণ এবং মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলাপ-আলোচনা এ সংকট সমাধানের ক্ষেত্র প্রস্তুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংগঠন আসিয়ানের সদস্যদের মধ্যে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যে এই লাখ লাখ শরনার্থীদের প্রতি মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মিয়ানমারের এ ধরনের কার্যকলাপের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। থাইল্যান্ড এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহবান জানিয়েছে। কিন্তু আসিয়ানের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায় নি। অন্যদিকে তুরস্ক কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে অংসান সু চির কাছে বার্তা পাঠিয়েছে। মুসলিম উম্মার কথিত নেতা বলে পরিচিত সৌদি আরবও নিরাবতা ভেঙ্গে রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বিপরীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের (?) বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সাথে থাকার ঘোষণা অমানবিক তামাসা হিসাবে বিশ্ববাসীর কাছে নতুন বার্তা দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এক বিবৃতিতে বলেছেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত এবং চীন বাংলাদেশের পাশেই থাকবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে যখন মিয়ানমারের এ অন্যায্যা আচরণের পক্ষ থাকার ঘোষণা দেন তখন আমাদের পররাষ্ট্র সচিবের এ ধরনের আত্নতুষ্টির ঘোষণার কার্যকারিতা নিয়েও যথেষ্টই সন্দেহ আছে বৈকি। আরেক পরাশক্তি ইরানও মিয়ানমারের এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়ে অবিলম্বে রোহিঙ্গা মুসলিম জাতিগত নিধনের এই উন্মত্ত খেলাকে বন্ধ করার আহবান জানিয়েছে। এতো সব নিন্দা কিংবা উদ্বেগ অথবা হুশিয়ারীর প্রতি বৃদ্ধা অঙ্গুলি প্রদর্শন করে মিয়ানমার তাদের এ জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। উল্টো দেশটির উগ্র জাতিয়াবাদী নেত্রী অংসান সু চি এ ধরনের কার্যক্রমকে ক্রমাগত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন বলে বিশ্ব গণমাধ্যম বরাতে জানা যাচ্ছে। একদা পুঁজিবাদী বিশ্বের তথাকথিত শান্তির রোল মডেল সু চি আজ বিশ্ব অশান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। আরও অবাক করার বিষয় মিয়ানমারের গণমাধ্যম অথবা সুশীল সমাজও এ ধরনের গণহত্যার বিরুদ্ধে কোনো প্রতীকি প্রতিবাদের আয়োজন করেছে কি-না সে খবরও নজরে আসে নি। তাহলে কী মিয়ানমারে গণমাধ্যম অথবা সুশীল সমাজ তথা বিবেকসম্পন্ন মানুষ বলে কেউ নেই? এটা খুব স্বাভাবিক যে দীর্ঘ দিন সামরিক জান্তার কবলে থাকার ফলে সেখানে সে ধরনের স্বাধীন গণমাধ্যম অথবা সুশীল সমাজ গড়ে উঠে নি। তাই বলে এ ধরনের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনে একটা সমগ্র জাতি নিশ্চুপ থাকার নজির বিশ্বে আর একটি নেই। সম্ভাবত উগ্র সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী এবং অন্ধ স্বাদেশীকতাবাদ মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন এবং সংখ্যাগুরু মানুষের মানবিক বিবেকবোধকেই ধ্বংশ করে দিয়েছে। রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনে তাদের এই উন্নাসিক মানসিকতাও কম দায়ি নয়।
সমস্যা মিয়ানমারের কিন্তু দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। যেহেতু এটি নতুন কোনো সমস্যা নয় তাই এ দুর্ভোগ দিনে দিনে এখন চরমে পোঁছেছে। তাই ঠিক দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে এবং এ সমস্যার সমাধান বিশ্ববাসীর কাছে অনিবার্য করে তুলতে হবে। সারা বিশ্বের পরাশক্তি থেকে শুরু করে শান্তিকামী প্রতিটি রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ঐক্যবদ্ধ করে মিয়ানমারের এ মানবতা বিরোধী কার্যক্রমকে যেমন থামাতে হবে, তেমনি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে। এটি স্বরণ রাখা প্রয়োজন বাংলাদেশের সঠিক কূটনৈতিক উদ্যোগের উপরে এ সংকটের সমাধান অনেকাংশে নির্ভর করছে। বাংলাদেশে নিয়োজিত কূটনৈতিকদের শরনার্থী শিবির পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়ার অত্যন্ত সময়োচিত উদ্যোগ ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের অনেকেই শরনার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও শরনার্থী শিবিরে ত্রান বিতরণ কার্যক্রমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও এই ইস্যুতে কাজে লাগানো যায় কি-না সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের ভাবা উচিত। পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের সাথে সাক্ষাৎকারের জোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে চীন এবং ভারতকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন কি-না সেটার ভাবার বিষয়। জাতিসংঘের আগামী অধিবেশনে এ ইস্যুতে মিয়ানমারের প্রতি প্রচণ্ড চাপ তৈরির প্ল্যাটফরম গঠনের উদ্যোগ বাংলাদেশকে এক্ষুনি নিতে হবে। বিশ্বে আঞ্চলিক জোট হিসাবে আসিয়ান সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচিত। এ জোটকে কিভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সফলভাবে কাজে লাগোনো যায় তা ভাবতে হবে। মোটকথা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঠিক এবং কঠোর অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই। অতীতে আমাদের দুর্বল অবস্থানের কারণেই বার বার রোহিঙ্গাদের বাঙালী বলে বাংলাদেশে পুশ ইন করার সফলতাই মিয়ানমারের পাশবিকতাকে ভয়াবহ করে তুলেছে। এর এখন অবসান হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় এ ইস্যুতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

আরও খবর

  • পাবলিকের টাকাতেই চলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
  • সু চির বক্তব্য : হতাশার মাঝেও আশার আলো আছে কী?
  • গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা ॥ অজানা ইতিহাসের খোঁজে…
  • রোহিঙ্গা সংকট নিরসন কোন পথে
  • দেশে সব নির্বাচনই হয়, শুধু ছাত্ররাই বঞ্চিত
  • প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফর ও আমাদের প্রত্যাশা
  • গান গেয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন রাবির ‘জর্জ হ্যারিসন’রা
  • ৭৫ এর ১৫ আগস্টের নাটোর
  • শেখ ফজিলাতুন নেছা- আমার মা
  • যুব সম্প্রদায় : বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্মাতা
  • চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে
  • হলি আর্টিজান হামলার নেপথ্য কথা ও ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ
  • মানুষের ভাল অভ্যাসগুলো অটুট থাকুক
  • পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও সচেতনতা প্রয়োজন
  • প্রসঙ্গ : শিশু গ্রেফতার
  • উপরে