ওরাই আগামীদিনের ‘বাংলাদেশ’

ওরাই আগামীদিনের ‘বাংলাদেশ’

প্রকাশিত: ১৯-০৩-২০১৭, সময়: ১৩:১১ |
খবর > মতামত
Share This

ইসমত জাহান জিনিয়া : ইট পাথরের শহরে, কাক ডাকা ভোরে যখন সূর্যের আলোয় চারদিক ঝলমল করে ওঠে তখন ব্যস্ত হয়ে ওঠে সর্বস্তরের মানুষের জীবন। জীবনের তাগিদে ছুটে চলে সবাই। বাস্তবময় হয়ে ওঠে কঠিন জীবন। সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের জীবন সংগ্রামটা বোধহয় আরও বেশি কঠিন। পেটের দায়ে গরীব মানুষগুলো হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যান দিনকে দিন। তবুও যেন বিরাম নেই। দারিদ্র্যের কষাঘাতে কোন দিন পেটে ভাত জোটে, আবার কোনদিন উপস কাটিয়ে দিতে হয়। তাদের কাছে সাদ-আহ্লাদ, ভালো খাবার, দামি পোষাক অলিক কল্পনা। তবে তারাও স্বপ্ন দেখে একটু সুন্দর করে বাঁচবে, সন্তানদেরকে সুন্দর সুন্দর পোষাক কিনে দিবে, মাঝে মধ্যে পার্কে বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরতে নিয়ে যাবে, স্কুলে পাঠাবে। কিন্তু পৃথিবীর নির্মমতার কাছে সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর বদলে পেটে ভাত জোটানোর দায়ে পাঠাতে হয় গ্যারেজে কাজে,  স্টেশনে মানুষের ভারি মাল বয়ে দিতে। শুরু হয় একটি অবুঝ শিশুর জীবন যুদ্ধ, প্রতিনিয়ত জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম। মাঠে-ঘাটে-স্টেশনে দুরন্ত ছুটে চলা। কারণে অকারণে মানুষের তীতা কথা শোনার পালা। কথায় কথায় নিপীড়ন আর নির্যাতন। সামান্য দু এক টাকার জন্য সমাজের ভদ্র শ্রেণীর হাতের দামি চড় থাপ্পড় যেন হয়ে যায় নিত্য দিনের সঙ্গী। তাদের চোখের পানিতে বুক ভাসলেও দেখার কেউ থাকেনা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সঙ্গ দোষে সে জড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ প্রবণতায়। ‘এক টানে দুই টানে কিছু হয় না’ ধারণা দিয়ে তার হাতে তুলে দেয়া হয় সিগারেট। একটা সময়ে এসে গাজা, হেরোইন, ফেনসিডিল তার কাছে কিছু মনেই হয় না। নেশার জগতকে বাঁচিয়ে রাখতে তার বেছে নিতে হয় চুরি ডাকাতি ছিনতাইয়ের মত অপরাধের পথ।
এরপরের কাহিনী সবার জানা। কোনো একদিন সে অপরাধ করতে গিয়ে ধরা পড়বে। কপালে জুটবে গণধোলাই।

ইসমত জাহান জিনিয়া

তারপর থানা পুলিশ। আর যাদের জন্য ওই শিশুটি বিপথগামী হলো, সমাজের সেই এলিট শ্রেণী নীতিবাক্য আওড়াবে।  আমরা আজ শিশু আধিকারের কথা বলি, শিশুদিবস পালন করি। কিন্তু হায় আফসোস! আজ ওই শ্রমজীবী শিশুগুলো হয়তো জানেই না যে শিশু দিবস নামেও কোনো দিবস এদেশে পালিত হয়।  জানবেই বা কী করে। তারা তো তাদের মৌলিক চাহিদার কোনোটিই ঠিক মত পায়নি। শিক্ষার আলো থেকে তারা আজ অনেক অনেক দূরে। দুবেলার খাবার জোগাড় করতেই তাদের হিমশিম  খেতে হয়। তাদের কী আর এসব দিবস ভাবার সময় আছে?
সেদিন ঘুরতে গিয়ে দেখলাম  আব্দুল্লাহ আর পলি (ছদ্মনাম)  নামের দুই শিশু বাদাম বিক্রি করছে। কথা বলে জানলাম তারা দুই ভাইবোন। একসাথে বাদাম বিক্রি করে যে টাকা পায় তা দিয়ে সংসার চালায়। দুজনের বয়স আর কতই হবে- আব্দুল্লাহর ৯ বছর আর পলি ৬ বছর বয়সী হবে। এইটুকু বয়সে তারা সংসারের ঘানি টানছে। মায়ের সাথে নিজেরাও উপার্যনে ব্যস্ত। পড়াশুনা করার ইচছা আছে কি না জানতে চাইলে তারা বলে ইচ্ছা থাকলেও তারা তা করতে পারে না। জীবন ও জীবিকার টানে আব্দুল্লাহ কিংবা পলির মত আরও অনেক শিশুই তাদের সুন্দর শৈশব কে বিসর্জন দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় বাদাম বিক্রি করে।
এরা কেউ কেউ কাজ করে পাড়ার হোটেল রেস্তোরাঁ গুলোতে। কেউ ইট ভাঙার কাজ করে। কখনো গাড়ি মেরামতের কারখানায় আবার এরাই কখনো বা টোকাই। অথচ তাদেরও একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ হতে পারতো। আমরা প্রায়ই বলে থাকি আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। কিন্তু যেভাবে এই শিশুগুলোর বর্তমানটি নষ্ট  হচ্ছে তাতে জাতি ভবিষ্যতে তাদের নিকট থেকে কি আশা করবে? শুধু তাই নয়, যেভাবে শিশু নির্যাতন চলছে তাতে শিশুরা সমাজে সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। রাজন, রাকিব এদের মত আরও অনেক শিশুই নর পিশাচদের হাতে হত্যা হয়েছে। হিংস্র পশুর থেকেও আজ মানুষ জঘন্য হয়ে উঠেছে। তাদের ক্রোধানলে আজ এই কোমলমতি শিশুরাও রক্ষা পায়নি। রাজন, রাকিব হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলেও শিশু নির্যাতন সমূলে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি এখনও। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৬ কোটি জনগণের মধ্যে ৬ কোটি শিশু রয়েছে। কাজেই তাদের অধিকার নিশ্চিত না করতে পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকারে চলে যাবে। যা হয়তো কারওই কাম্য নয়। শিশুদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে এখনো শিশুর অপুষ্টি একটি প্রধান সমস্যা। আমরা বর্তমানে একটি উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছি। কাজেই দেশকে উন্নত করতে হলে সেখানে শিশুকে কিংবা শিশু অধিকারকে বাদ দিয়ে কখনই উন্নয়ন করা সম্ভব না। তাই শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার  কথা মাথায় রেখে আমাদের উন্নয়নের কথা চিন্তা করতে হবে। শিশুরা হলো চারাগাছ। একটা চারাগাছের সুন্দরভাবে যত্ন নিলে একসময় তা আমাদের ফুল দিবে, ফল দিবে। কাজেই সেই চারাগাছটির সঠিক দেখভাল করা আপনার আমার সকলেরই দায়িত্ব। শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য সরকারকে অবশ্যই কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে। একুট দায়িত্বশীলতার সাথে ওদের প্রতি যত্নবান হতে হবে সকলকে। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। তাদের সুশিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র তথা মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সে ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট ভুমিকা পালন করতে হবে। ওরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। ওরাই তো আগামীদিনের বাংলাদেশ।
লেখক : ইসমাত জাহান জিনিয়া, ১ম বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

উপরে