চালকের সাজায় ধর্মঘট ও আমাদের পরিবহন খাত

চালকের সাজায় ধর্মঘট ও আমাদের পরিবহন খাত

প্রকাশিত: ২৭-০২-২০১৭, সময়: ১৮:১২ |
খবর > মতামত
Share This

পলাশ আহসান : এই লেখাটি যখন লিখছি তখনই খবর পেলাম চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণাঞ্চলের পরিবহন ধর্মঘট তুলে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে ছয় দিন পার হয়েছে। এখন ধর্মঘট তুললেই কী আর না তুললেই কী। বীর বিক্রমে একটি স্বেচ্ছাচারের ছয় দিন পার হলো। এখন ধারাবাহিকভাবে দেশের মানুষ বিস্মিত হয়ে দেখছে, আদালতের বিচারে একটি রায় দেয়া হলো। সেখানে নানা বিবেচনায় একজন ঘাতক প্রমাণ হলো। সেই ঘাতকের শাস্তির ঘোষণা হলো। এটি একটি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া। খুব সহজ সরল বিষয়। কিন্ত এই সরল বিষয়টি পছন্দ হয়নি পরিবহন শ্রমিকদের। তাদের যুক্তি, প্রতিদিন তো কত দুর্ঘটনায় মানুষ মরা যায়। সেসব বিচার হয় না। হঠাৎ এসব বিচার কেন?
আদালত অবমাননা নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন।ঠিকই বলছেন। পরিবহন শ্রমিকরা আদালত অবমাননা করছে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার আলোচনার ইস্যু ভিন্ন। আমি বলতে চাই, এই যে স্বেচ্ছাচার, এটিই আমাদের গোটা পরিবহন ব্যবস্থার চিত্র। সে যেই হোক সেই রিক্সা থেকে শুরু করে লঞ্চ পর্যন্ত। সবারই আচরণের মূল সুর একই-“আমরা যেভাবে চলছি এভাবেই চলতে হবে, এখানে আমরাই আইন, আমরাই আদালত” দিনের পর দিন সভা-সেমিনার আইন আদালত নিয়ম, কী হয়নি? অথচ আমাদের পরিবহন ব্যবস্থাকে কোনভাবেই কাঠামোবদ্ধ করা যায়নি।
তৃণমূলের বাহন রিক্সার কথাই যদি ধরি। কী দেখি। আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই সবাই একমত হবেন। এই ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি নিয়মিত বাড়ে রিক্সাভাড়া। পাঁচ বছর আগে যে দূরত্বের জন্যে ৩০টাকা দিতে হতো একই দূরত্বের এখন একশ টাকা দিতে হয়। কোনভাবেই কী এই বাড়তি ভাড়া যৌক্তিক? তারও চেয়ে বড় কথা কে এই ভাড়া ঠিক করে দিল? আরো বড় কথা এই ঠিক করার মত কোন কর্তৃপক্ষের অস্তিত্বের কথা কী আমরা জানি? যেহেতু কোন কর্তৃপক্ষই নেই সেহেতু চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারী হতে ক্ষতি কী?
পরিবহনে স্বেচ্ছাচারের আরেক বড় উদাহরণ সিএনজি চালিত অটোরিক্সা। এর শুরু হয়েছিল একটা বড় কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে এটি কখনই আর নিয়মের মধ্যে আসেনি। এর জন্যে খোদ সড়ক ও সেতু মন্ত্রী রাস্তায় নেমেছেন। কিন্তু তাদের নিয়মের মধ্যে আনা যায়নি। বার বার দাম ঠিক করে দিলেও মিটারে গাড়ি চালাতে চালকরা নারাজ। ওই যে লেখার শুরুতে বলেছিলাম পরিবহন কর্মীদের মূল সূর “আমিই আইন আমিই আদালত”। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমার দেখা এখন পর্যন্ত এই পরিবহনটিকেই সবচেয়ে বেশি আইন মানানোর চেষ্টা করা হয়েছে।এর ফলে এদের কেউ কেউ এখনো মিটারে গাড়ি চালান। কিন্তু গাড়িতে ওঠার সময় বলে নেন ২০/৩০টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু টাকা বাড়িয়েও যেতে রাজি হন না ৮০ভাগ সিএনজি চালক।
সিএনজি চালক না যেতে রাজি হলে সেজন্যে মামলা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু পাঠক একবার চিন্তা করুন। আপনি রাস্তায় বের হলেন ৭ থেকে ৮ জন ফিরিয়ে দেয়ার পর, একজন রাজি হলেন মিটারে যেতে। আপনি কী ওই ৮ জনের নামেই মামলা করবেন? ওদের আইন ভঙ্গকারীর সংখ্যা এত বেশি যে কেউ যদি প্রত্যেকের নামে মামলা করতে চান, তিনি সারাদিন অন্য কোন কাজ করতে পারবেন না, মামলা করেই দিন পার করতে হবে।
কবি গুরুর “দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ংকর” আপ্তবাক্যটি যে কত সত্যি তা আমাদের সিএনজিতে না উঠলে বোঝা যেতো না। ধরুন আপনি সিএনজিতে উঠলেন, প্রয়োজন এত বেশি যে ওর স্বেচ্ছাচারেই রাজি হয়েছেন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর অনেকটা নির্দেশের ভঙ্গিতেই সিএনজি চালক আপনাকে বলবে “ট্রাফিক জিগাইলে কইয়েন মিটারে যাইতেছি” ভাবুন আপনি কী বিপদে আছেন, বে আইনী ভাবে টাকা তো দিচ্ছেনই, আবার মিথ্যা বলে সেটা আপনাকেই জায়েজ করতে হচ্ছে। আদালতের রায়েই বলা হয়েছে, যে বাসের চাপায় তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ ছয় জন মারা গিয়েছিল সে বাসটির গতি নিয়ন্ত্রক ইচ্ছে করেই নষ্ট করে রাখা হয়েছিল। বাসটি ছিল ভুল পাশে। গতি ছিল বিপজ্জনক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। তার পরেও চালককে দোষী ভাবছেন না আমাদের পরিবহন মালিক শ্রমিকরা।
অবশ্য এরও একটা ধারাবাহিকতা আছে। কারণ অনিয়ম করতে করতে সবকিছুই তাদের কাছে স্বাভাবিক। রাজধানীর বাসগুলোর কথা ধরেন না কেন, আগের দিন যে বাসটিকে দেখেছেন গাদাগাদি করে যাত্রী নিচ্ছে, রাস্তায় নেমে সেটিকে দেখলেন গেটলক সার্ভিস হয়ে গেছে। যদিও বাসটিতে লক করার মত কোন গেট নেই। তবু বাসটিতে উঠলেন। এবং দেখলেন, যেখানেই যান না কেন, একটা নির্ধারিত ভাড়া দিতে হচ্ছে। কে এই নিয়ম করেছে? কেন করেছে? এইসব করতে গেলে যাত্রীর জন্যে কী কী সুবিধা রাখতে হয়? এসব কোন উত্তর চাইলেই আপনাকে ওই শ্রমিকের সঙ্গে ঝগড়া করতে হবে। এক পর্যায়ে আপনাকে বলবে না পোষালে নেমে যান। কোন ব্যাখ্যা নেই, তাই আবারো মনে পড়বে “ আমিই আইন আমিই আদালত”।
যখনই পরিবহন খাতে অনিয়মের কোন কথা ওঠে তখন যে কোন ক্ষমতাবানই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অসায়ত্ব প্রকাশ করে। অথচ আমি অন্তত দুই জন মন্ত্রীর কথা জানি যাদের একজন পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি এবং আরেকজন পরিবহন মালিকদের সভাপতি। এই খাতে আরো বহু জনপ্রতিনিধি সরাসরি জড়িত। তাদের কথা না হয় বাদ দিলাম। অন্তত দু’দুজন মন্ত্রী যে খাতের নিয়ন্ত্রক সেখান থেকে তো জনগণের স্বস্তি আসা উচিত ছিল। কিন্তু আসলে ওই খাত থেকে যে কী অনুভূতি আসছে, তা মানুষ প্রতিদিন বুঝছে নিজের জীবন দিয়ে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষ এই পরিবহন জনিত অস্বস্তির জন্যে কাকে দায়ী করবে? নাকি শুধু দীর্ঘশ্বাসই ফেলবে?

উপরে