পুকুর খননে জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা মানা হচ্ছে না

পুকুর খননে জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা মানা হচ্ছে না

প্রকাশিত: ১১-০২-২০১৭, সময়: ২১:৩৯ |
খবর > মতামত
Share This

ইউ রহমান : রাজশাহী জেলার বৃহত্তম উপজেলা বাগমারা। এই উপজেলা একটি কৃষিপ্রধান উপজেলা হিসাবে অনেক পূর্বে থেকেই সুনাম রয়েছে। কৃষি হচ্ছে এই উপজেলার ৯০% লোকের আয়ের উৎস্য এবং জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এই উপজেলার সকল মৌজার জমি অতি উর্বর ও সমতল। ফলে এখানে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য ও রবিশস্য যেমন- ইরি, বোরো, আমন, আউশ ধান, আলু, গম, ভুট্টা, শরিষা, মরিচ ও পিয়াজ ইত্যাদিসহ ব্যাপক হারে সবজি জাতীয় ফলের উৎপাদন হয়। যা এই এলাকার সর্বসাধারনের চাহিদা মিটিয়েও নিজ জেলাসহ পার্শ্বপর্তী বিভিন্ন জেলায় রপ্তানী হয়ে থাকে। এমনকি বাগমারা উপজেলা থেকে উৎপাদিত কিছু উল্লেখযোগ্য ফসল যেমন- আলু, গম, ভুট্টা, শরিষা দেশের বাহিরেও রপ্তানী হয়। তাই আমাদের উর্বর কৃষি আবাদি জমির যথার্থ ব্যবহারের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাগমারা উপজেলা কৃষি নির্ভরশীল হওয়ায় এই উপজেলা রাজশাহী জেলার মধ্যে ফসল উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকারী হিসাবে খুবই সুপরিচিত। তথাপিও ২/৩ বছর পূর্বে উক্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উর্বর আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করে এলাকার কিছু লোকজন স্বল্প পরিসরে পুকুর খননের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভাবে মৎস্য চাষ করে আসলেও সে সময় এলাকার আপামর লোকজন জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা সম্পর্কে তেমন সচেতন ছিল না। পাশাপাশি উক্ত নীতিমালা প্রয়োগে তেমন কোন কার্যকরি উদ্যোগ বা পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কিন্তু তৎপরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবাধে ও নির্বিকারে উর্বর আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করে পুকুর খননের কাজ ব্যাপক হারে প্রসারিত হতে থাকলে জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালার সুষ্ঠ বাস্তবায়নের জন্য উপজেলার সর্বত্র আবাদী কৃষি জমিতে পুকুর খনন কাজ করা থেকে বিরত থাকবার জন্য এলাকার সকল ইউনিয়নে পূর্ববর্তী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে সর্বস্তরের জনসাধারণকে এই আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে মাইকিং করে প্রচার প্রচারনা করেছেন। কিন্তু ইহাতে কিছুদিন উক্ত পুকুর খনন কাজ স্বল্পমাত্রায় বিরাজমান থাকলেও সাম্প্রতিককালে জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা লংঘন করে এলাকার শিক্ষিত সচেতন যেমন- স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কিছু কিছু জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় ও তাদের সহযোগিতায় স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবাধে ও নির্বিঘ্নে শতশত হেক্টর আবাদী উর্বর কৃষি জমি নষ্ট করে ব্যাপক হারে পুকুর খনন কাজ করছে। ইহাতে এলাকার সাধারণ জমির মালিক চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
অর্থের লোভে বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে ১০ বছরের জন্য লীজ সম্পাদন করে নিলেও তারা মন থেকে মেনে নিতে পারছে না বা প্রভাবশালীদের উক্ত রূপ কর্মকান্ডের কোন প্রতিবাদও করতে পারছে না। কারণ এই অবৈধ পুকুর খননকারীদের স্থানীয় প্রভাব অনেক বেশী। কোথাও কিছু অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। স্থানীয় প্রশাসন লোক দেখানোর জন্য যেনতেনভাবে এসে পুকুর খনন কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করে গেলেও পরে আর উক্ত নির্দেশের কার্যকারিতা বেশিদিন স্থায়ী থাকে না। তেমনিভাবে প্রভাবশালীদের কাজও বন্ধ থাকে না এটা বড়ই রহস্যময়।
আবার থানা থেকে দিনের বেলায় পুলিশ এসে পুকুর খননের কাজে ব্যবহৃত এ্যাক্সভেটর মেশিনের চাবি নিয়ে গেলে রাতের বেলা কি কারনে আবার ড্রাইভারের হাতে চাবি চলে আসে। এইভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যমান জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা লংঘন করে দিনের পর দিন হাজার হাজার হেক্টর উর্বর আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করে পুকুর খনন কাজ চলতে থাকিলে আগামী ২/৪ বছরের মধ্যে বাগমারা উপজেলার কোন মৌজায় আর আবাদী জমির অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। এই ক্ষেত্রে উর্বর আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করে পুকুর খনন বিষয়ে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্র-পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হলেও তাতেও উপজেলা প্রশাসন জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি মালার প্রয়োগ ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে তড়িৎ কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালার বিধান মতে, কৃষি জমি যতটুকু সম্ভব কৃষি কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জমির প্রকৃতগত পরিবর্তন আনা যাবে না। তাছাড়াও আরো বলা আছে, কৃষি জমি সাধারণ ভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি হলেও এর ব্যবহার সার্বিক জাতীয় সামাজিক প্রয়োজনীয়তার সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় কৃষি নীতিতে ফসল উৎপাদনের জন্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ নীতিমালাতেও উল্লেখ রয়েছে যে, কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষে গৃহীত সকল প্রচেষ্টা পরিবেশ সম্মত হতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য মূলক ও পরিবেশ সম্মত জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা অনুসরণে ভূমি ক্ষয়রোধ, ভূমির উর্ব্বতা সংরক্ষণ এবং দেশের বিভিন্ন ইকো-সিস্টেমের সহিত সংগতিপূর্ণ ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের দেশে অধিকহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আমাদের মাথা পিছু জমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে কৃষি আবাদী জমির পরিমাণ ক্রমশই সংকোচিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে এই ক্রমবর্ধমান বৃহৎ জনগোষ্ঠির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত কৃষি জমির সার্বিক পরিমাণ বিভিন্ন কারণে অতিমাত্রায় হ্রাস পাচ্ছে। ভূমির সর্বোত্তম সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা একান্ত আবশ্যক। পাশাপাশি ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার প্রতিরোধকল্পে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে বাগমারাবাসী উর্ধ্বতন প্রশাসনের একান্ত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

উপরে