৪২ বিড়ালের মা কাউন্সিলর আলেপা খাতুন

প্রকাশিত: ২৪-০৪-২০১৯, সময়: ১৭:০২ |
Share This

রাজিউর রহমান রুমী, পাবনা : ৪২ বিড়ালের মা হয়ে এলাকায় আলোরন সৃষ্টি করেছেন আলেপা খাতুন। বয়স ৬০ বছর। তিনি পাবনার চাটমোহর পৌরসভার ৪,৫,৬ ওয়ার্ডের দুই বার নির্বাচিত নারী কাউন্সিলর। কাউন্সিলর হলেও সবাই তাকে বিড়ালের মা বলে ডাকেন। মানুষটি অতি সহজ সরল। নেই কোন অহংকারের লেশ। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান বিড়ালের খাবার সংগ্রহের জন্য। সকালে বাজারে যান কম দামে বিভিন্ন মাছ কিনতে। সেগুলো রান্না করে বিড়ালের মুখে দিয়ে তারপর তিনি নিজের খাবার মুখে নেন। ৩০ বছর ধরে এই কাজটি করে চলছেন তিনি।

আলেপা খাতুন বলেন, প্রতিদিন ৪ কেজি চাল ও ১ কেজি টাকি বা সিলভার কাপ মাছ রান্না করতে হয় তাকে। রান্না শেষ হলেই খাবারের গন্ধ পেয়ে একে একে ছুটে আসে তার ৪২টি বিড়াল। তিনি আরো বলেন এরাই আমার ছেলে- মেয়ে ! এমন পরিবারের কথা শুনে সবাই চমকে উঠলেও দীর্ঘদিন ৪২টি বিড়ালকে নিজের সন্তানের মতোই লালন-পালন করে আসছেন তিনি। প্রতিটি বিড়ালের আলাদা আলাদা নাম রাখা হয়েছে, কালু,আকাশ, বাতাস, পায়েল,লালু,ইত্যাদি নামে ডাকলে আলাদা আলাদা ছুটে আসে তারা। এসব বিড়াল অসুস্থ হলে তিনি পশু হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেন। নিজেও প্রাথমিক চিকিৎসা শিখে নিয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন টিকাও দিয়ে থাকেন তাদের। তিনি বলেন, কোন বিড়াল অসুস্থ হলে আমি তার মায়ায় সেদিন ভাত খেতে পারি না। সারা দিন শুধু বসে বসে কাঁদতে থাকি। কারন সন্তানের যদি কিছু হয় মা যেমন কস্ট পায় তিনিও ঠিক তেমন কস্ট পান। তেমনি আমার (আলেপা) যদি কোন দিন শরীর খারাপ থাকে তাহলে বিড়াল গুলো এসে আমার মাথা নেড়ে দেয়, আদর করে এবং সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত ও মন খারাপ করে থাকে। সারা রাত তারা মনের কস্টে আমার বেডের চারপাশে ঘুড়াফেরা করে। কেউ কেউ আমার মশারির মধ্যে এসে শুয়ে থাকে।

বিড়ালের মা আরো বলেন, আমি যখন পৌর সভায় যাই তখন তারা না ফেরা পর্যন্ত পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার আসার শব্দ পেলেই চার দিক থেকে ছুটে আসে আমার কাছে। কেউ আমার কোলে এসে বসে, কেউ কেউ আমার কাধে উঠে আনন্দ করতে থাকে। তখন আমার মন ভরে যায়। তখন আমার মনে হয় সত্যি আমি ওদের প্রকৃত মা হতে পেরেছি।

তিনি বলেন, এই বিড়ালের জন্য আমি কোন আত্মিয় স্বজনের বাড়ী গিয়ে একটি রাতও কাটাতে পারি না। আমি একবার পৌর সভার কাজে একটি ট্রেনিং এ ঢাকা গিয়েছিলাম। কিন্ত বিড়ালের মায়ায় আমি ট্রেনিং শেষ না করেই চলে আসি। কারন সে কয়েক রাত আমি একটুও ঘুমাতে পারছিলাম না। শুধু বিড়ালগুলো কি খাচ্ছে এসব কথা মনে পড়ছিল।

আলেপা খাতুন আরো বলেন, প্রতি মাসে আমি যা আয় করি সবই বিড়ালের খাবার কিনতে ব্যায় করে ফেলি। ওদের পিছনে প্রতি মাস ১০ হাজারের বেশি খরচ হয়ে যায়। এই নিয়ে আমার ছেলের বউ ও ছেলে অনেক রাগারাগি করে। কারন আমার নেই একটা ভাল থাকার ঘর, উপরে কয়েক খানা টিন দিয়ে একটি ছাপরা তুলে সেখানে আমি আর বিড়ালগুলো থাকি। চাল দিয়ে পানি পরে। বৃষ্টির দিনে ওদের অনেক কস্ট হয়। আমি ওদের খাবারই দিতে পারি না আবার থাকার যায়গার তৈরীর টাকা পাব কোথায়। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো বিড়ালদের নিয়ে বেঁচে থাকবো। ওদের আমি কোন দিন ফেলে দিতে পারবো না।

স্বামী-সন্তানদের কথা জিজ্ঞেস করতেই আবেগী হয়ে ওঠেন আলেপা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাপ-মা ছোট বয়সে বিয়ে দিয়েছিল। সংসার কি বুঝতে পারি নাই। ২৬ বছর আগে ছেলে মহরম গর্ভে থাকতে স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে যায়। অনেক কষ্টে ছেলে মহরমকে মানুষ করেছি। ছেলে এখন রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। কিছুদিন আগে ছেলেকে বিয়ে দিয়েছি। সবাই আমাক ভালোবাসে। মানুষ টাকা খরচ করে আমাকে ভোটে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। মানুষের ভোটে কাউন্সিলর হয়েছি। প্রতিদিন এলাকার মানুষদের কাছে যাই খোঁজ-খবর নেই’।

তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, আমি স্থানীয় জন প্রতিনিধির কাছে তার বিড়ালের খাবারের জন্য কিছু সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্ত তারা কোন সহযোগিতা করেন নাই। ফলে ৪২ বিড়ালের প্রতিদিনের খাবার যোগাতে তাকে চরম হিমশিম খেতে হয়। তবুও নিজে না খেয়ে বিড়াল নামক সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়েই তৃপ্তি পান বিড়ালের মা আলেপা খাতুন।

উপরে