মৃত ব্যক্তির আর্তনাদ

প্রকাশিত: 26-02-2019, সময়: 17:28 |
Share This

হঠাৎ করে কানে ভেসে এলো ধ্বনী
কান পেতে শুনি, শুনি বারে বারে।

কে যেন মাইকিং করে বলে
একটি শোক সংবাদ, শোক সংবাদ।

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন,
মারা গেছে আমাদের বন্ধু জীবন।

আমি বলছি রেগে, মাইকিংং করেছে কোন পাগলে,
আমার নামটি বার বার ধরে।

সামনে আছে আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে,
বললাম আমি তাঁকে ডেকে।

আমার নামে করছে যে মাইকিং,
চিনিস কি তুই তাঁকে?

এতো ডাকি তবুও বন্ধু,
কেন জানি মোর পানে ফিরে নাহি চাহে।

অশ্রু চোখে ছল ছল, দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভ হয়ে,
সেও যেন শুনছে মাইকিং, কান পেতে।

লাগছে না ভালো আমারও,
কে যেন ডাকছে বাড়ি থেকে আমারে।

ছুটে যেতে লাগলাম বাড়ির পানে,
শত শত লোক যেন আছে বসে আমারই গলি পথে।

কান্নাকাটি করছে একে অপরে,
ধীরে ধীরে যাচ্ছি এগিয়ে বাড়ির পানে।

সামনেই দেখি বড় ভাই, অশ্রু জলে গেছে ভিজে জামা,
হাতে যেন সাদা কাপড়ের প্যাকেট খানা।

থর থর পায়ে যাচ্ছি বাড়ির দিকে এগিয়ে,
বলছি আমি, কি নিয়ে যাস? কারো কিছু হয়েছে নাকি রে?

কেউ যেন শুনে না মোর কথা,
দেখেও কেউ যেন দেখে না মোরে।

বাড়ির সামনে যেতেই দেখি,
কে যেন বারান্দাই খাটিয়াই রয়েছে শুয়ে।

খাটিয়ার পাশে রয়েছে,
আমারই সহধর্মিণী দাঁড়িয়ে।

চোখে নাহি জল,
আছে দাঁড়িয়ে হয়ে পাথর।

ছেলে মেয়ে দুটি কেঁদে ভাসাই বুক,
মা মা বলে, বাবা কেন আছে ওখানে শুয়ে।

বাবা, বাবা বলে ডাকি শতবার,
রয়েছে তাকিয়ে, কথা বলে না যে।

মা, ও মা, তুমি ডাকো একবার,
বাবা হয়তো উঠবে জেগে।

আত্মীয় স্বজনেরা বলছে তাকে,
নে চেয়ে নে ক্ষমা, আর কি পাবি তাকে দেখতে।

হাতটি ধরে তারা ছুয়ে দিলো পায়ে,
চিৎকার দিয়ে, জড়িয়ে ধরে ছেলেদের বলে,

মরে থাকতে বিছানাই পড়ে,
ভাই মারতো কিল আর আমি দিতাম সুড়সুড়ি তোমার পায়ে।

আবার তুমি করছো সেই খেলা,
দেতো ভাই কিল, আমি দিই সুড়সুড়ি পায়ে,
দেখি বাবা কতক্ষণ শুয়ে থাকতে পারে।

হঠাৎ চিৎকার দিয়ে কেঁদে বলে মা,
দিস না আঘাত তোরা, কষ্ট পাবে তোদের বাবা।

সে যে গেছে মরে, রেখে আসতে হবে,
যেখানে তোর দাদা-দাদীর কবর আছে সেইখানে।

ছেলে মেয়ে মোর যাপ্টেধরে কেঁদে কেঁদে বলে,
নিয়ে যেতে দিবোনা বাবাকে, রেখে দাও এই ঘরে।

করবো না বিরক্ত, চাইবোনা কিছু,
চাইবোনা ঘুরতে, শুধু দেখবো বাবাকে।
ডাকবো বাবা, বাবা বলে।
আমি দাঁড়িয়ে শুধু দেখছি তাদের।

বুকফেটে পাচ্ছে কান্না,
কিছুইতো পারছিনা করতে।

কে যেন ওদের ছিনিয়ে নিয়ে গেলো
আমারই বুক থেকে।

নিয়ে গেলো আমাকেও, দিয়েদিলো গোসল,
বরইপাতা মেশানো গরম জলে।

পরিয়ে দিলো নতুন সাদা কাপড়,
মুখ যে দিলো ঢেকে।

নিয়ে যাচ্ছে আমায়,
খাটিয়ায় চড়িয়ে দোয়া-দুরুদ পড়তে পড়তে।

আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া দাহু লা শারিকালাহু,
ওয়া আশহাদুআন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলূহ।

নিয়ে যাচ্ছে আমায় ধীরে ধীরে,
ছেলে মেয়ে আমার ছুটছে খাটিয়ার সাথে সাথে।

কাঁদতে কাঁদতে ছুটছে,
বাবা-বাবা বলে।

একে একে করে সবাই, দিয়ে গেলো মাটি,
আমার জানের টুকরা ছেলে মেয়ে, তারাও দিলো মাটি।

যেতে চায় না তারা কবর ছেড়ে,
যাপ্টে ধরে আছে তারা কবরের বেড়াটিকে,
বলছে তারা, বাবা ও বাবা,
আর কি দেখতে পাবো না তোমাকে।

মা বকা দিলে,
ছুটে গিয়ে যাপ্টে থরতাম তোমাকে।

বাবা ও বাবা তোমার তো আছে অনেক শক্তি,
এসো বাবা কবর থেকে উঠে, চলো যাই বাড়িতে।
তোমার বুকে মাথা না রেখে ঘুমাতে পারি না যে।

বাবা ও বাবা, সন্ধ্যা হলে চলে এসো,
তুমি ছাড়া রাতে পারবো না ঘুমোতে।

তাদের নানা-মামা সবাই বোঝায় তাদের,
চল বাড়ি তাড়াতাড়ি,
কাঁদছে তোদের মা, খুজছে তোদের কে।

এই বলে ভুলিয়ে নিয়ে গেলো তাদের,
রেখে গেলো আমায় একলা করে।

আমি চিৎকার দিয়ে বলছি তাদের,
রেখে যাসনা তোরা আমায় ফেলে,
এই অন্ধকার কবরে।

আমার এই চিৎকার শুনতে পায় না কেউ,
রইলাম পড়ে একা এই অন্ধকার কবরে।

ভেঙ্গে গেলো ঘুম,
সবশেষে দেখি আমি শুয়ে আছি,
আমারই ঘরের বিছানাতে।

লেখক : মোকশেদ উল আলম সুমন,

রাণীবাজার, মিয়াপাড়া, রাজশাহী।

উপরে