মেধা আর সম্ভাবনার ইতি বাল্যবিবাহে

প্রকাশিত: ৩১-১০-২০১৮, সময়: ০০:০২ |
Share This

জোবায়দা শিরিন জ্যোতি : প্রাথমিকে নিয়মিত প্রথম হতো কাজলী খাতুন সাথী (১৮)। মাধ্যমিকে তা আর ধরে রাখতে পারে নি। বিয়ের সমন্ধ নিয়ে এ-ও দেখতে আসতো। বাড়িতে বিয়ে নিয়ে কথা চলতো। সমাজ সংসারের বাধনে আটকা পড়ে সাথীর স্বপ্ন আর মেধা বিকশিত হয় নি। পদ্মাপাড়ে বাজে কাজলা বস্তি এলাকায় দেড় বছরের মেয়েসহ স্বামীকে নিয়ে বাস করছে একসময়ের মেধাবী ছাত্রীটি।

সাথীর বাবা জালাল উদ্দিন কৃষিকাজ করেন। মা জাহেমা বেগম। পরিবারে বাবা-মা, দুই বোন, এক ভাই আর সাথী। পনের বছর বয়সে নবম শ্রেণির ছাত্রী থাকা অবস্থায় বিয়ে হয় তার। প্রাইমারি পাশ করার পরই শুরু হয় সাথীর বিয়ের চেষ্টা। বাবা লেখাপড়ার খরচ দিয়ে চায় নি। স্কুলে পড়ার খরচ না লাগলেও বইখাতা কেনা থেকে শুরু করে আনুসাঙ্গিক খরচ চালাতে বাবা রাজি ছিলো না। এছাড়া নিরাপত্তার ওজরে সাথীকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়া হয়। বয়স আঠারো না হলেও কাগজ কলমে প্রাপ্তবয়ষ্ক দেখানো হয়েছে। সাথী জানায়, সে প্রথমে মত দেয় নি। পরে বাবা বলেছে আর লেখাপড়া করাতে পারবে না। বাধ্য হয়েই বিয়েতে মত দিতে হয়।

প্রাইমারিতে প্রতি ক্লাসে প্রথম হতো সাথী। পরে বিয়ের চাপে পড়ালেখায় আর ভালো করা হয় নি। বিয়ের সময় স্বামীর বয়স ছিলো একুশ। বিয়ের পরে ৪/৫ মাস ভালোই ছিলো। তারপর শুরু হয় শ্বাশুড়ির মানসিক নির্যাতন। বাপের বাড়ির জিনিস না আনতে পারাটাই সাথীর দোষ হয়ে দাড়ায়। এরই মধ্যে ষোল বছর বয়সে সে অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়ে। সন্তান পেটে থাকা আবস্থায় ভারী কাজ করতে হয়েছে। কণ্যা সন্তানের জন্ম দেয়ার পর তার ওজন কমতে থাকে। সাথী জানায়, এখন প্রায়ই মাথা ঘুরায়, দুর্বল বোধ করে। সন্তান হওয়ার পর পুষ্টিকর খাবার পায় নি। তাই মা আর মেয়ে দুজনেই ওজনস্বল্পতা আর অপুষ্টিতে ভুগছে।
অর্থনৈতিক সামর্থ ছিলো না বলে বাবা মায়ের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য হতে হয় সাথী। শত অত্যাচার অবহেলাতেও সংসার ছাড়ে নি। সে বলে ‘বিয়ে মানুষের জীবনে একবারই হয়। আমার বাবা-মা অনেকবার ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছে। কিন্তু আমি যাই নি।’ স্বামীর কম উপার্জনের কারনে পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের জোগান দেয়া সম্ভব হয় না। নিজে কাজ করতে চাইলে স্বামীর অনুমতি লাগবে। নতুন করে সুযোগ পেলেও সংসারের চাপ সামলে লেখাপড়া আর করা হবে না বলে মনে করে এক সময়ের মেধাবী ছাত্রীটি।

যে বাড়িতে সাথী থাকে সে বাড়িটি শাহানার। এখন তার বয়স চব্বিশ। কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নাই। পরিশ্রম আর চিন্তার স্পষ্ট ছাপ মুখে। বারো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিলো। খেলনা হাড়িপাতিল হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সত্যিকারের সংসারের দায়িত্ব দেয়া হয় ঘাড়ে। কম বয়সে বিয়ে হওয়ায় শারীরিক মানসিক নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। চৌদ্দ বছরে প্রথম সন্তানের জন্ম দেয়। বছর দুয়েক আগে স্বামী সেলিম মারা যায়। দুই কণ্যার জননী শাহানা এখন মানুষের বাড়ি কাজ করে। শাহানা বলে, ‘ ছোটতেই বিয়ে হয়ে গেছে। লিখাপড়া শিখতে পারি নাই। চাকরি-বাকরি করতে তো লিখাপড়া করতে হয়। বিদ্যা নাই, তাই লোকের বাড়িত গিয়া কাজ করতে হয়।’

সুযোগের অভাবে আরো কোনো মেয়ের জীবন থেমে যাক এমনটা চায় না সাথী বা শাহানা কেউই। ‘পরিবার বাল্যবিবাহ দিতে চাইলে কণ্ঠস্বর জোরালো করতে হবে। প্রয়োজনে ঘরে ঘরে প্রতিবাদ করতে হবে। তবেই বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে’Ñ একই স্বরে বলছিলো দুজনে। নিজের মেয়েকে কোনোভাবেই অপরিণত বয়সে বিয়ে দিবে না কেউই। মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়ে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছে কাজলী খাতুন সাথী। শাহানাও মনে করেন লেখাপড়ার বিকল্প নাই। লেখাপড়া জানা থাকলে লোকের বাড়িতে কাজ করতে হতো না। জীবনটা হয়তো আরো সুন্দর হতো। মেয়েদেরকে লেখাপড়া শেখাবেন এই সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন জীবনের রণক্ষেত্রে।

সাথী বা শাহানার মতো অনেক কিশোরীকে লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়তে দেখেছেন রাজশাহী নগরীর খাদেমুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ফাতেমা তুজ জোহরা। তিনি বলেন, ‘ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উঠতে উঠতেই অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। নবম শ্রেণিতে সংখ্যাটা আরো বেড়ে যায়। অধিকাংশ বিয়ে পরিবারের ইচ্ছাতেই হয়। বেশির ভাগেরই বিয়ের সাথে সাথেই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। যে কয়েকজন টিকে থাকার চেষ্টা করে তারাও সংসারের চাপে লেখাপড়া ছাড়তে বাধ্য হয়।’ অধিকাংশ বিয়ে শিক্ষকদেরকে না জানিয়েই দিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষকেরা বিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও জানান এই শিক্ষক।

আঠারো বছরের আগে কোনো কিশোরী যেন বিয়ের শিকার না হয় সে লক্ষ্যে দেশের নানান অঞ্চলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এরই একটি অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সালিমা সারোয়ার জানান, ‘বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের শিশুদল বাল্যবিবাহরোধে কাজ করছে। ইতোমধ্যে আমরা অনেক বাল্যবিবাহ রোধ করতে সক্ষম হয়েছি। তবে অনেকে ৬ মাস বা ১ বছর পর আবারো বিয়ে দিচ্ছেন। কেউ আবার অন্য অঞ্চলে গিয়ে বিয়ে পড়াচ্ছেন। এক্ষেত্রে সকলের সচেতনতা অধিক জরুরী।’ এসিডি ২০১৬ সালে ৩৯টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করার উদ্দোগ নিয়ে ২৪টি এবং ২০১৭ সালে ১৪৪০টির মধ্যে ১৪১টি বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর ধারা ৮ অনুযায়ী কোনো অভিভাবক বাল্যবিবাহ দিলে তার ৬ মাস থেকে ২ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির রাজশাহী সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট দিল সিতারা চুনি বলেন, ‘যে শাস্তির বিধান করা হয়েছে, তা আসলে খুবই কম।’ আইনের নতুন সংশোধনীতে বিশেষ কারণবশত বিয়ের বয়স কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মুসলিম বিবাহ হলো একটা কন্ট্রাক্ট। কম বয়সী একটা মেয়ের ক্ষেত্রে এটি গ্রহণ করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়’।

উপরে