‘মায়ের কোল সন্তানের আশ্রয়স্থল’

প্রকাশিত: ১২-০৫-২০১৮, সময়: ২০:১৩ |
Share This

মনিরুজ্জামান শেখ রাহুল : আজ ১৩ মে, বিশ্ব মা দিবস। দিবসটি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদনের জন্য। মা দিবসের উদ্ভবের পিছনে রয়েছে অনেক ইতিহাস। এই দিবসের সুত্রপাত হয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে। গ্রীকের মাদারিং সানডে অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে উদ্ভব হয় এই দিবসটির। তখন দেবীদের মা হিসেবে আরাধনা করা হতো। তাদের পুজা করা হতো। আমেরিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হো নামের এক নারী মা দিবস পালনের দাবী উত্থাপন করে। সম্ভবত সেই সময়ই আনা জার্ভিস নামের আরেকজন নারী মায়ের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে সেখানকার সবাইকে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সচেতনতা গড়ে তুলতে আগ্রহী হন। ১৯০৫ সালে আনা জার্ভিস মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর তার কন্যা আন্না মারিয়া জার্ভিস তার মায়ের অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য কাজ শুরু করেন। আন্না জার্ভিসের মায়ের মৃত্যুবার্ষিকি ছিল ১৯০৫ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার। সেজন্য সে এই দিনটিকে মা দিবস পালনের জন্য আগ্রহী হন। এরপর তিনি বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিকট তার এই বার্তা পৌছাতে শুরু করেন। পরিশেষে ১৯১৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উভ্রো উইলসন সেই দিনটিকে ‘মা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর সারা বিশ্বে ১৯৬২ সাল থেকে মা দিবস পালিত। দিবসটি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে তারিখে পালিত হয়। আমাদের দেশে পালিত হয় মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে।

সন্তানকে দীর্ঘদিন গর্ভধারন করেন মা। নয় মাস ধরে সন্তানকে নিজের গর্ভে রাখার পর ভূমিষ্ঠ করে। সন্তানকে এই বিশ্বের সুন্দর প্রকৃতি চেনায়। তাই মায়ের অবদান অনস্বিকার্য। এই মা গর্ভধারনকালীন সময় কতই না কষ্ট করে। দৈনন্দিন চলাফেরা ও খাওয়া দাওয়াতেও মেনে চলে, যাতে তার সন্তান ভালো থাকে। গর্ভে থাকা অবস্থায় সেই সন্তান যখন মায়ের পেটে লাথি মারে, তখন সেই মমতাময়ি মা লাথির আঘাত সহ্য করে নেয়। ভূমিষ্ঠ সন্তানের মুখ দেখেই সে তার প্রসব ব্যাথা ভূলে যায়। কতই না মমতা ও প্রেম থাকে মায়ের অন্তরে। এই পৃথিবীতে অনেক ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে জন্ম দেয় মানুষ নামের এক মাংসপিন্ডকে। তাই আমাদের সকলের উচিত মায়ের প্রতি ভালোবাসা স্থাপন করা। তবুও আমি মাঝেমধ্যে ক্রোধিত হয়, যখন দেখি কিছু অবাধ্য সন্তান তার মায়ের প্রতি অত্যাচার করে। এইরকম ন্যাক্কারজনক কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে করা তখনই সম্ভব নয়। ধিক্কার জানাই সেসব রক্ত মাংসে গড়া অমানুষদের, যারা এই জঘন্য কাজ করে। সবসময় মায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশিল হতে হবে। কেননা তিনি আমাদেরকে নৈতিক শিক্ষা দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। মায়ের কাজের মর্যাদা দেওয়া ও মায়ের সকল ইচ্ছা পুরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে সন্তানকে। মা ও সন্তানের অগাধ ভালোবাসা দিয়ে এই পৃথিবী হয়ে উঠবে সুখময়। কথায় আছে ‘বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ এর অর্থ বন্যপ্রাণীরা বনে থাকতে পছন্দ করে। আর শিশুরা পছন্দ করে তার মায়ের কোল। আপনি দেখবেন ছোট্ট শিশু আপনার কোলে থাকার সময় তার মাকে দেখলে ছটপট করবে, কান্নাকাটি করবে তার মায়ের কোলে যাওয়ার জন্য। যখন সে তার মায়ের কোলে যাবে তখন তার লাফালাফি বন্ধ হবে, কান্নার পরিবর্তে হাসবে। মাকে তার সবচেয়ে আপনজন মনে হয়। মায়ের কোলই পৃথিবীর প্রত্যেক সন্তানের পরম শান্তির আশ্রয়স্থল। যেখানে সবাই হাসিখুশি থাকে।

মা শব্দটি ছোট হলেও তার অর্থ ব্যাপক। মমতা ও ভালোবাসা লুকিয়ে আছে এই নামটির মধ্যে। মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের করে অনেক লেখক ও কবি অনেক কিছু লিখে গেছেন ও লিখছেন। সেই লেখকও তার জীবনের প্রথম বই বের করে তখন বইটি তার মাকে উৎসর্গ করে। সন্তানের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হলেই এমনটা সম্ভব। মা তার সন্তানকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করে। এই সীমাহিন কষ্টের কথা কখনই লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। মা আদর্শ জাতি তৈরী করে থাকে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, ‘তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিবো।’ এই কথা দিয়েই বোঝা যায় মা শিক্ষিত জাতির জননী। ইতোমধ্যে আমি অনার্স শেষ করেছি। হয়ত গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি নিজেই। কিন্তু আমার মা যদি আমাকে স্কুলে ভর্তির আগে চক, পেন্সিল ও সিলেটে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ লিখা না শিখাত তাহলে হয়ত আজ আমি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে পারতাম না। তাই আজ আমার মায়ের প্রতি জানাই আন্তরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা। আমি তার কাছে চিরঋণী। তার ঋণ কখনই পরিশোধযোগ্য নয়।

আমি অবাক হই, যখন দেখি সন্তান থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু বৃদ্ধ মা-বাবা বৃদ্ধাশ্রমে তাদের জীবন অতিবাহিত করে। বিশ্বাসই হয় না, যে মা ও বাবা তার সন্তানকে এত কষ্ট করে মানুষ করল, তাদের মধ্যেই কিছু সন্তানেরা তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে চলে যায়। তারা কিভাবে ভুলে যায় মা ও বাবার ভালেবাসার কথা? সেইসব ঘৃনিত মানুষদের জন্য একসময় এই পৃথিবী হবে অশান্তির স্থান। সর্বক্ষণ মা ও বাবার সেবাযত্ন করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। আজকের এই দিন মায়ের প্রতি ভালোবাসাকে স্মরণ করানোর দিন। শুধু আজকের দিনই নয়, প্রতিটা দিনই মায়ের প্রতি ভালোবাসা অক্ষুন্ন রাখা প্রত্যেকেরই উচিত। একজন মা কত মহৎ ও কত উদার হতে পারেন তাঁর উৎকৃষ্ট উদাহরন স্থাপন করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। নিপীড়িত ও নির্যাতিত অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রতি তাঁর যে অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে, তা থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি। যার স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি বিশ্বে ‘মানবতার জননী’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন। আমরা বাঙ্গালি জাতি তাঁর এই উদারতায় মুগ্ধ ও গর্বিত।

মা ও সন্তানের ভালোবাসার সম্পর্ক অটুট থাকুক সবসময়, এই প্রত্যাশা করি। বিশ্বের সকল মায়ের জন্য সুস্থ্যতা কামনা করি। এই দিনে সকল মায়ের প্রতি জানাই শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসা।

উপরে