রাজশাহীর মুক্তিদাতা বিদ্যালয়ে অর্থের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান

প্রকাশিত: 22-08-2017, সময়: 23:42 |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : দরীদ্র, অসহায়, ঝড়েপড়া ও পথশিশুদের মধ্যে শিক্ষা ও মানবতার আলো ছড়ানোর ব্রত নিয়ে এবং সমাজ থেকে সব ধরনের অজ্ঞতা, অন্ধকার, কুসংস্কার, পাপময়তা, দুর্বলতা, অপরাধ প্রবনতা, জরা জীর্ণতা, সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে রক্ষা ও মন্দতা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে ১৯৮৬ সালে কয়েকজন দেশী-বিদেশী মিশনারীদের প্রচেষ্টায় রাজশাহী রাজপাড়া থানার বাগানপাড়ায় (ডিংগাডোবা বাইপাস নিকটবর্তী) প্রতিষ্ঠা করেন “মুক্তিদাতা জুনিয়র হাইস্কুল”। ১৯৯০ খ্রি: স্কুলটি প্রাথমিক সেকশন সরকারী স্বীকৃতি লাভ করে। বেসরকারি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি হাটি হাটি পা পা করে ত্রিশ বছর পার করেছে। এখন স্বপ্ন দেখছে উপরের দিকে পা রাখতে। সম্পূর্ণভাবে এটা একটি বেসরকারি শিক্ষা সেবা প্রতিষ্ঠান। কোন বিদেশী সাহায্য ছাড়াই বর্তমান যুগোপযোগী, মানসম্মত শিক্ষাদান, কষ্টের মাঝে দৃঢ় মনোবল, মানসিক শক্তি ও স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলছে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে।
বর্তমানে নার্সারী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা সেবায় স্বল্প বেতনে পাঠদান করাচ্ছেন ১৩জন শিক্ষক ও তাদের সেবায় রয়েছেন ২জন স্টাফ। সবুজ বনানী ঘেরা এই সুন্দর মনোরম পরিবেশে অবস্থিত স্কুলটি শিক্ষার্থীদের অতি প্রিয়, আকর্ষণীয় বিদ্যা নিকেতন। যদিও আদিবাসী এলাকা এবং সিংহভাগ আদিবাসী শিক্ষার্থী, তথাপি সমাজের সকল স্তরের, সকল ধর্মের, বর্ণের, গোষ্ঠীর মানুষের জন্য বিদ্যালয়টি উন্মুক্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ব্যতিক্রমধর্মী এই অর্থে যে এখানে রয়েছে গরীব মধ্যবিত্তের পাশাপাশি সমাজের অসহায়, অবহেলিত, অধিকার বঞ্চিত পথ শিশু, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীগণ। স্কুলটি রাজশাহী কাথলিক ধর্মপ্রদেশ শিক্ষা কমিশন দ্বারা পরিচালিত।
এই স্কুলে শুধু হিন্দু, খ্রীষ্টান, আদিবাসী শিক্ষার্থী নয় মুসলিম শিশুরাও শিক্ষা গ্রহণ করছে। স্কুলে যেয়ে দেখা যায় এই সকল শিশুদের মধ্যে পথশিশু , অভিভাবকহীন শিশু ও প্রতিবন্ধি শিশুরাও সমান তালে সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করছে। স্কুলে নেই বাহিরের কোলাহল, নেই কোন রাজনীতি, নেই কোন মারামারি, নেই কোন পরিচালনা পর্যদ নিয়ে দন্দ। তাদের দেখলে মনে হয়না কোন অভাব বা অর্থের কারণে বিদ্যালয়ের ৩২২ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন অনিশ্চয়তার দিকে ক্রমন্বয়ে ধাপিত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়–য়া চিটাগংগের এতিম শিশু হৃদওয়ানুল ইসলাম বলেন এখানকার প্রধান শিক্ষকের সান্নিধ্যে যদি না আসতাম এবং এই বিদ্যালয়ে যদি লেখাপড়া না করতাম তাহলে হয়তো আমার স্থান হতো কোন বস্তিতে। হয়তো টোকাই হতাম, নেশা করতাম কিংবা আরও খারাপ কিছু। আমি এখন মানুষ হয়ে দেশের ও দশের সেবা করার আশা করছি।
অস্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রতিবন্ধি নীলমনি চঁড়ে বলেন, আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধি। আমি অত্যন্ত হতদরীদ্র আদিবাসী পরিবারে জন্মেছি। এখানকার শিক্ষক ও কর্তপক্ষ যদি আমাকে শিক্ষা গ্রহ্রণ করার সুযোগ না দিতেন তাহলে আমাকে রাস্তায় বসে ভিক্ষা করে জীবন চালাতে হত। এখন আমি অস্টম শ্রেণিতে পড়ছি। ভবিষ্যতে দিদিমনিদের মত শিক্ষক হয়ে আমিও অন্যের জীবনে দ্রুতি ছড়াতে চাই। আমাদের এই দ্রুতি ছড়ানো অব্যাহত রাখকে আমি হ্রদয়বান ব্যক্তিদের সহযোগিতা চাই। তার মত অন্য শিক্ষার্থী আয়েশা আকতার, সারতী, শিশিলা ও অনিতাসহ বিদ্যালয়ে সকল শিক্ষার্থী একই দাবী জানান সরকারসহ সকলের নিকট।
স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা সিস্টার মাবেল রোজারিও বলেন, আমি ঢাকায় জন্ম নিলেও এবং বিদেশ থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহন করলেও এই সকল শিশুদের প্রকৃত আলোয় আলোকিত করতে এই আদিবাসী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু বিদ্যার্জন নয়, পাশাপাশি নৈতিক চরিত্র গঠন, মানবীয়, সামাজিক, ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশ স্বাধন, বিবেক জাগরণ, পূর্ণাঙ্গ, পরিপক্ক, আলোকিত মানুষ, হিসেবে গড়ে তোলা বলে আমি মনে করি। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই এলাকার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রকমের অভাবী।
সবার জন্য একটি সুন্দর, আনন্দময়, প্রতিশ্রুতিময় জীবন উপহার দেওয়াই হচ্ছে আমার রুপকল্প। আমাদের বিদ্যালয়ে বর্তমান ডিজিটাল শিক্ষা পদ্ধতিতে তথ্য-প্রযুক্তি বিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়গুলো শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ অপ্রতুল যেমন, প্রজেক্টর, কম্পিউটার, প্রিন্টার। সেইসাথে রয়েছে শিক্ষার্থীদের বসার ব্রেঞ্চ, শিক্ষা উপকরণ যেমন চক, ডাস্টার। শিশুদের নাস্তা, প্রয়োজনীয় ষ্টেশনারী ও জন্মলগ্নের আলমারী মেরামত ও নতুন করে ক্রয় করা প্রয়োজন।
এছাড়াও শিক্ষকদের বিগত পাঁচ বছর ধরে বেতন বন্ধ রয়েছে। বেতন না পাওয়ায় তারা এই দূর্র্মূল্যের বাজারে সংসার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেকায়দায় রয়েছেন। চাকরী করার সুবাদে তারা না পারছেন কারও নিকট হাত পাততে। প্রধান শিক্ষক বলেন তারা নিজেদের অর্থ খরচ করে শিক্ষার্থীদের নাস্তা ও অন্যান্য ছোট ছোট খরচ গুলো মেটাচ্ছেন । এই অবস্থা থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা করে প্রধান শিক্ষক, সমাজের উদারপ্রাণ মানুষ, বিত্তশালী ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতি আহবান জানান।
তিনি বলেন প্রতি বছর এত প্রতিকুলতার মধ্যে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক শিক্ষা টুর, সরকারী বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন, বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা করা এবং তাদের সংস্কৃতিমনা ও মানষিকভাবে মুক্তচিন্তা করে গড়ে তোলার জন্য চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন বাহিরে স্কুলের অবকাটামো সুন্দর হলেও ভবনের ভিতরের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। দেয়াল চটে গেছে এবং কোথাও কোথাও ভেঙ্গে গেছে। ভবনটি মেরামত করাও অতি জরুরী হয়েছে পড়েছে বলে তিনি জানান।
বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও তাদের সংসারের কথা চিন্তা করে এবং আগামী দিনে সুবিধা বঞ্চিত সকল শিশুদের নিয়ে পাঠদান অব্যাহত রাখার জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

উপরে