‘ছেলেধরা’ আতঙ্কে গণপিটুনির হিড়িক, পুলিশের হুঁশিয়ারি

‘ছেলেধরা’ আতঙ্কে গণপিটুনির হিড়িক, পুলিশের হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত: ২০-০৭-২০১৯, সময়: ১৯:২৪ |
Share This

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : সারাদেশে ছেলেধরা আতঙ্কে গণপিটুনির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর গণপিটুনিতে ঢাকায় দুই ও নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে নিহতদের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ। এদিকে গুজবে কান দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল। এছাড়া গণপিটুনি দিয়ে মানুষ মারাকে বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে এগুলো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

শনিবার রাজধানী ঢাকার উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক নারী নিহত হয়েছেন। সকাল পৌনে নয়টার দিকে কাঁচাবাজার সড়কে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, উত্তর বাড্ডায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদরাসা পাশাপাশি অবস্থিত। সকাল সাড়ে আটটার দিকে তিনজন বোরকা পরিহিত নারী ওই এলাকায় যান। তারা স্কুলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। বাধার মুখে দুজন পালিয়ে গেলেও আরেকজন গণপিটুনির শিকার হন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

কেরানীগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে অজ্ঞাতপরিচয় দুই যুবককে গণপিটুনি দিয়েছে এলাকাবাসী। এতে একজন নিহত হয়েছেন। অন্যজনকে গুরুতর আহতবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মালঞ্চ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সকাল সাড়ে আটটার দিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন হযরতপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, সকালে দুই যুবক গ্রামে ঘোরাঘুরি করতে থাকে এবং শিশুদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। এতে তাদের উপর সন্দেহ হলে এলাকাবাসী ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মালঞ্চ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক এক যুবককে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাত (১৮) এক যুবক নিহত হয়েছেন। সকাল নয়টায় মিজিমজি পূর্বপাড়া পাগলাবাড়ি রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে।

জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের পাগলাবাড়ী রোড এলাকায় সকাল নয়টার দিকে ৫/৬ বছরের এক মেয়ে শিশুর হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন ওই যুবক। এ সময় শিশুটি কান্নাকাটি শুরু করলে স্থানীয় দুই যুবকের সন্দেহ হয়। তারা ওই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করলে যুবকটি কোনো সদুত্তর দিতে না পারায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দেয়া হয়। খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতাল নিয়ে যায়। হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অপরদিকে পাবনায় ছেলে ধরা সন্দেহে রাসেল রানা (৩২) নামে এক যুবককে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে পাবনার চাটমোহর উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের বনগ্রাম বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আটক রাসেল ঈশ্বরদী উপজেলার আমবাগান এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী জানান, শনিবার সকালে বনগ্রাম দীঘিপাড়া গ্রামের নায়েব আলীর ছেলে মো. আবদুল্লাহ (৪) বাড়ির সামনে রাস্তায় পাশে বসে খেলছিল। এ সময় রাসেল রানা নামের ওই যুবক শিশুটিকে ডেকে চুইংগাম দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সেই চুইংগাম না নিয়ে আব্দুল্লাহ দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তার হাত ধরে রাসেল হাতে থাকা ব্যাগ থেকে একটি বাটালি (কাঠমিস্ত্রীদের কাজে ব্যবহৃত) বের করে শিশুটির পিঠে আঘাত করে। পরে শিশুটির চিৎকারে স্থানীয়রা এসে রাসেলকে আটক করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে খবর দেয়। এসময় তার হাতে থাকা ব্যাগ থেকে একটি বাটালি, দুইটি ফিক্স জেল আঠা এবং একটি খাতা উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে থানার এসআই আবদুল গণি মিয়া ও এসআই মাহবুব উল্লাহ সরকার অভিযুক্ত রাসেলকে আটক করে থানায় নিয়ে যান।

এবিষয়ে চাটমোহর থানার ওসি সেখ নাসীর উদ্দিন জানান, ঘটনাস্থল থেকে রাসেল রানা নামে এক যুবককে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার (রাসেল) বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়া গাজীপুরে ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে এলাকাবাসী পিটিয়ে আহত করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ৪৫ বছর বয়সী এই নারীর বাড়ি নেত্রকোণার দুর্গাপুর এলাকায়। তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গাজীপুরের বাসন থানার ওসি একেএম কাউসার বলেন, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ওই নারী এক দম্পতির কাছে গিয়ে তাদের শিশুকে আদর করতে গেলে তারা তাকে আটক করেন। পরে স্থানীয়রা তাকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে আহত করে পুলিশে দেয়। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক প্রণয় ভূষণ দাস বলেন, তার শরীরে নীলা ফুলা জখম রয়েছে। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত।

গণপিটুনিতে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে: গুজবে কান দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল। এছাড়া গণপিটুনি দিয়ে মানুষ মারাকে বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে এগুলো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

শনিবার বিকেলে এক বার্তায় এ নির্দেশনা দেয়া হয়। পুলিশ সদর দফতর জানায়, পদ্মা সেতু নির্মাণে মাথা লাগবে- একটি মহল এমন গুজব ছড়ানোর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।

পুলিশ সদর দফতর আরও জানায়, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি একটি ফৌজদারি অপরাধ। আইন নিজের হাতে তুলেন নেবেন না। গণপিটুনির ঘটনা তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।

উপরে