রাজশাহী-৪ আসনে শক্ত অবস্থানে গুরু-শিষ্য

রাজশাহী-৪ আসনে শক্ত অবস্থানে গুরু-শিষ্য

প্রকাশিত: ১৭-০৮-২০১৮, সময়: ১৯:১১ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : একসময়ে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে বহুল আলোচিত বাগমারা সেই দুর্নাম ঘুচিয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। বিশাল আয়তনের এই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪ আসন। কৃষি প্রধান এই এলাকাকে এক সময় রাজশাহীর দুর্গম এলাকা বলা হতো। তবে সে দুর্নামও মুছে গেছে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডে। রাস্তা ঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়াও শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাগমারা এগিয়েছে কয়েক ধাপ। ফলে রাজশাহীর অন্যকোন উপজেলা থেকে বাগমারাকে পিছিয়ে রাখার আর সুযোগ নেই।

রাজশাহীর সবচেয়ে বড় উপজেলা ৩৬৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বাগমারায় ইউনিয়ন রয়েছে ১৬টি। আর পৌরসভা দুইটি। এ আসনে ১৯৭০, ’৭৩ ও ’৮৬ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে এবং ’৮৮ ও ’৯১ সালে জাতীয় পার্টির টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন প্রয়াত সরদার আমজাদ হোসেন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির টিকেটে এমপি হন সাবেক আমলা আবু হেনা।

২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আসনটি দখলে আসে আওয়ামী লীগের। দলের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন দেশের বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বারের মতো এমপি হন। এবারও তিনি মনোনয়ন চাইবেন তা নিশ্চিত।

তবে এ আসনে এবার মনোনয়ন চান গুরু-শিষ্য। এরা হলেন, বাগমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম সান্টু ও তাহেরপুর পৌরসভার দুইবারের মেয়র আবুল কালাম আজাদ। জাকিরুল ইসলাম সান্টু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং আবুল কালাম আজাদ তাহেরপুর পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখায় তাদের দুইজনকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের হাই কমান্ডে সুপারিশ করা হয়েছিল প্রায় বছর খানেক আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ নিয়ে দলের হাই কমান্ড কোন সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় শক্ত অবস্থান নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন এক সময়ের এই দুই তুখোর ছাত্র নেতা।

আওয়ামী লীগ পরিবার থেকে উঠে আসা জাকিরুল ইসলাম সান্টু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা ছাত্রলীগের গুরুত্বপুর্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক এমপি সরদার আমজাদ হোসেন জাতীয় পাটিতে যোগদান করলে বাগমারা আওয়ামী লীগকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন সান্টু। তাই তাকে বলা হয় আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কান্ডারি। গত উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান হওয়ার আগে সান্টু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার তার স্বপ্ন আইন প্রনেতা (সংসদ সদস্য) হওয়ার।

১৯৭৯ সালে জাকিরুল ইসলাম সান্টু বাগমারা উপজেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালিন প্রথম কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তখন তিনি পড়তেন অস্টম শ্রেণীতে। ১৯৮১ সালে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৮৩ সালে একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় সান্টু রাজশাহীর শাহমখদুম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও ১৯৮৬ সালে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর পর ১৯৮৯ এবং ১৯৯১ সালে দুই মেয়াদে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন সান্টু।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে দুইবার গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হন সান্টু। ওই সময় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ পূর্বভাগ ছাত্র থাকা অবস্থায় মামলা ও কারাবন্দি থাকার কারণে শিক্ষা বিরতি দেন। পরে তিনি বিএ ও এলএলবি পাশ করেন।

১৯৯১ সালে বাগমারার বড়বিহানালী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করে তিনি প্রথম জনপ্রতিনিধি হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সান্টু। এরপর ১৯৯২ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের চারবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিন। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

জাকিরুল ইসলাম সান্টু দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হিসেবেই আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চান বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। তবে দলের প্রয়োজনে নৌকা প্রতীক যাকেই দেওয়া হোক না কেন, তার হয়েই আমরা কাজ করব।’

৯০’র শুরুর দিকে জাকিরুল ইসলাম সান্টুর হাত ধরে স্কুল জীবনে ছাত্রলীগের রাজশাহীতে জড়িয়ে পড়েন রাজশাহীর অন্যতম বানিজ্যিক এলাকার তাহেরপুর পৌরসভার দুইবারের মেয়র আবুল কালাম আজাদ। রাজনীতির শুরুতেই তিনি তাহেরপুর উচ্চ বিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। এর পর ১৯৯১ সালে আবুল কালাম আজাদ এসএসসি পাশ করেন। এসএসসি পাস করার পর তিনি তাহেরপুর ডিগ্রী কলেজ এইচএসসিতে ভর্তি হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। ৯৪ সালে তিনি এইচএসসি পাস করেন। এ বছরের শেষের দিকে তাহেরপুর ডিগ্রী কলেজ ছাত্রলীগের সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পান আবুল কালাম আজাদ। তবে ১৯৯৪-৯৫ সেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য বিজ্ঞান ও লাইব্রেরী ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হয়ে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি।

১৯৯৬ সালে জিয়া হল শাখার সহ-সভাপতি ও পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান। ১৯৯৭ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সম্পাদক হন। সম্মেলনের আগের রাতে ২৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ছাত্র শিবির পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে তান্ডব চালায়। ওই সময় শিবিরের গুলিতে আহত হন তিনি। ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস পাশ করেন। তারপর যুক্ত হন জেলা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। ২০০৩ সালের সম্মেলনে তিনি জেলা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি হন। ২০০৪ সালে তাহেরপুর পৌরসভা শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন বিনাপ্রতিদ্বন্দীতায়।

আবুল কালাম আজাদের তথ্যমতে, ২০০৭ সালের ৫ এপ্রিল র‌্যাব সদস্যরা রাজশাহীর আদালত চত্ত্বর থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় চোখ বেঁধে। রাতে প্রচন্ড মারপিট করে শুরু হয় ক্রসফায়ার নাটক সাজানোর প্রক্রিয়া। এরপর গভীর রাতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দুর্গাপুরের তেতুলতলা। সেখানে তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে বলে কালেমা পড়ানো হয় কালামকে। তাকে মেরে ফেলার জন্য অদৃশ্য চাপও ছিল। তবে গুলি করার আগ মহুর্তে একটি মোবাইল ফোনের কল তাকে বাঁচিয়ে দেয়। গুলি করা হয় তার দুই পায়ে। সেখানে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায় তারা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি করে। হাসপাতালে তার দুই পায়ে অপারেশন করে বের করা হয় চারটি গুলি।

তার ভাষ্যে, তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে একজন মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে রাতেই খবর পান তৎকালিন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (বর্তমান মেয়র)। তিনি সাথে সাথে রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান শিখরের মাধ্যমে খবরটি শেখ হাসিনার (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) কাছে পৌঁছান। সে সময় শিখর ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তগত সহকারি। শেখ হাসিনা বিষয়টি জানার পর র‌্যাবের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার জন্য দায়িত্ব দেন মতিয়া চৌধুরীকে। সাথে সাথে তিনি র‌্যাবের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন। এভাবেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন এই তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা।

এর পর ২০১১ সালে তাহেরপুর পৌরসভার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে মেয়র নির্বাচিত হন। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী হলেও এ নির্বাচনে তাকে সার্বিক সহযোগিতা দেন এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। পরে ২০১৫ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় বারেরমত মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।

মেয়র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে ভোটারদের পাশে আছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়অমী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও আমার বিষয়ে অবগত আছেন। রাজনীতিতে আমার ত্যাগ ও অবদান বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে এবার দলীয় মনোনয়ন দেবেন বলে আমি আশাবাদী।’

আরও খবর



উপরে