জনবল সংকটে ধুকছে রামেক হাসপাতাল

জনবল সংকটে ধুকছে রামেক হাসপাতাল

প্রকাশিত: ০৮-০৭-২০১৯, সময়: ০০:২৪ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : ওয়ার্ডের ভেতরে-বাইরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ভাঙা দরজা ও দুর্গন্ধযুক্ত অপরিস্কার টয়লেট ব্যবহারের উপায় নেই। হাসপাতালের চতুরদিকে ফাঁকা জায়গাগুলোতে শুধুই আগাছা আর আবর্জনা, ড্রেনগুলোও অপরিস্কার। ওয়ার্ডগুলোতে কুকর-বেড়ালের অবাধ বিচরণ। প্রবেশ দ্বারে যানবাহনের জটলা। দালাল ও রিপ্রেজেন্টেটিভদের দৌরাত্ম। ওয়ার্ড বয়দের উৎকোচ। দিনরাত মশার উপদ্রব। রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সদের অসহযোগীতা ও দুর্ব্যবহার। সব মিলিয়ে চরম অব্যবস্থাপনায় ধুকছে উত্তরের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা সেবার প্রতিষ্ঠান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক জনবলের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

শুক্রবার হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, মেডিকেল ব্লাড ব্যাংক (লিফট সংলগ্ন) বিভাগের ওপরের সিড়ির আড়ালে প্রতিদিন চলে ফেন্সিডিল, প্যাথেডিনসহ প্রায় সবধরণের মাদক গ্রহণ। চক্ষু ওয়ার্ড সংলগ্ন লিজ দেয়া ক্যান্টিনটির সমনে প্রকাশ্যে চলছে ধুমপান। উৎকট দুর্গন্ধযুক্ত রন্ধন শালায় অবাধ বিচরণ বেড়ালের। সেখানে সংসার পেতে বাচ্চা দিয়েছে ৮ থেকে ১০টি। আর প্রতিদিন সৃষ্ট হচ্ছে বিশাল মেডিকেল বর্জ্য, সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নেই কোন নিজস্ব উদ্যোগ। নেই কইফিয়ত নেয়ার কেউ। রোগীরা কিছু বললেই ছুটে আসে সাদা এ্যপ্রণধারীরা।

এমনই বিড়ম্বনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ভয়সহ নানা মুখি ঝুঁকি নিয়ে বাধ্য হয়েই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রামেক হাসপাতালে আসা রোগীদের। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ রামেক হাসপাতালে প্রতিদিনের চিত্রটা এখন এমনই।

মোহনপুর উপজেলা থেকে আসা মলয় সরদার অভিযোগ করে বলেন, তার স্ত্রীকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করার পর বেড পাওয়া যায়নি। তাই তাকে টয়লেটের পাশে বারান্দার মেঝেতেই রাখাতে বাধ্য হয়েছি। এখানে ময়লার স্তুপ পরে থাকে দিনের বেশির ভাগ সময়। ২৪ ঘন্টা টয়লেটের দুর্গন্ধ। চারপাশে স্যাঁতস্যাঁতে।

পুঠিয়া উপজেলার সজিবের স্ত্রী মেডিসিন ওর্য়াডে ভর্তি রয়েছেন। তারও একই অভিযোগ। তিনি আরো অভিযোগ করে জানান, বেড দিতে এখানে পক্ষপাতিত্ব করা হয়।

রাজশাহী শহরের বাসিন্দা লিকায়ত মোল্লা বলেন, অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন রোগীরা। তিনি আরো জানান, উত্তরবঙ্গের বিশাল আয়তনের এই হাসপালটি শুধামাত্র অব্যবস্থাপনার কারণে নাগরীকদের উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পাছেন না। সেই সাথে চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানসিকতা ও দায়িত্ব বোধের অভাবও রয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি রাজশাহী মহানগর পুলিশের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রামেক হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের দুর্ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসলে উপস্থিত পুলিশের কর্মকর্তারাও বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে জানান, পুলিশ সদস্যরাও সেবা নিতে গিয়ে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের দ্বারা বিভিন্ন সময় অপমানিত হন।

উত্তরবঙ্গের বৃহৎ এই সরকারী হাসপালাতটির চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ সরকারী এই হাসপাতালটিতে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ রোগীকে সেবা দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক, ইন্টার্ণ ও নার্সদের। স্বল্পতা রয়েছে প্রয়োজনীয় অন্যান্য জনবলেরও।

হাসপাতালটির ইমার্জেন্সি বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, প্রতিদিন তিন সিফটে এখানে গড়ে মোট ৬০০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। গত ৪ জুলাইয়ের হিসেবে সেবা নিয়েছেন ৫৮০ জন, ৫ জুলাই সেবা নিয়েছেন সাড়ে পাঁচশজন রোগী। এই রোগীদের অধিকাংশই রাজশাহী, চাঁপাই, নাটোর, নওগাঁসহ আশপাশের জেলার।

একসময়ের ৫৫০ শয্যার হাসপাতলটি বর্তমানে আসন বাড়িয়ে এক হাজার ২০৬টি শয্যা করা হয়েছে। তবে ৫৭টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ভর্তি থাকছে অন্তত ২২শ থেকে ২৫শ রোগী। সেই সাথে রয়েছে তাদের স্বজনদের চাপ।

এদিকে রোগীদের আসন বৃদ্ধি করা হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক বা জনবল বৃদ্ধি করা হয়নি বলে জানা গেছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ২৪০ জন চিকিৎসক, প্রায় ২৫০ জন ইন্টার্ণ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক। আর এ পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত রোগী সামালদিতে হচ্ছে ইন্টার্ণ ডাক্তাদেরকেই। রোগীদের সামাল দিতে তাদের কাজ করতে হচ্ছে প্রায় ১৮ ঘন্টা।

অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় প্রতিদিন কয়েকগুন বেশি রোগীর থাকলেও রাউন্ডের পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আর ওয়ার্ডে পাওয়া যায় না। পরবর্তি সময়গুলোতে মধ্যম পর্যায়ের কয়েকজন চিকিৎসক, ইন্টার্ন ও নার্সেরাই চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যান। তবে অতিরিক্ত রোগীদের চাপ সামাল দিতে না পারায় প্রায়ই রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন ডাক্তারদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।

ইন্টার্ণ চিকিৎসকদের অভিযোগ, তাদের দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা কর্মক্ষেত্রে থেকে সেবা দিতে হচ্ছে। তবে কর্মক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। সেই সাথে রোগীদের ধৈর্যচ্যুতির কারণে অনেক সময় ঘটছে অনাকাঙ্খিত ঘটনা। যা তাদেরও কাম্য নয়।

তারা আরো জানায়, হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক রয়েছে মাত্র ৫৫ শাতাংশ। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর মারাত্মক স্বল্পতা রয়েছে। যারা হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখবে এমন জনবল রয়েছে মাত্র ৫০ শাতাংশ।

এবিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপ-পরিচালক ডা. মো. সাইফুলের সাথে কথা হলে তিনি জানান, কর্মক্ষেতে নতুন যোগ দেবার কারণে এই মুহুর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না। পরে খোঁজ নিয়ে জানানো হবে।

উপরে