পাবনা-১ আসনের প্রার্থী নিয়ে বিএনপি-জামায়াতে দ্বন্দ্ব

পাবনা-১ আসনের প্রার্থী নিয়ে বিএনপি-জামায়াতে দ্বন্দ্ব

প্রকাশিত: ০৪-১১-২০১৮, সময়: ১২:০০ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাঁথিয়া : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম ৬৮, পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনটি। গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনসহ সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের জানান দিচ্ছেন বিভিন্নদলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। আর এসব কার্যক্রমে ক্ষমতাসীন আ.লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এগিয়ে আছেন। যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নির্বাচনী এলাকা হওয়ায় এ আসনের প্রতি দৃষ্টি রয়েছে গোটা দেশবাসীর। তাই এ আসনে রাজননৈতিক দলগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রার্থী বাছাই করে থাকে।

জানা গেছে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অথবা জানুয়ারির প্রথম দিকে নির্বাচন সম্পন্ন করবেন বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকে সামনে রেখে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। তবে ক্ষমতাশীন আ.লীগে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের গুজব। কোন কোন নেতা বলছেন, তার মনোনয়ন নিশ্চিত। আবার কেউ কেউ এটাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের মনোনয়নের বিয়য়ে কর্মীদের আশ্বস্ত করছেন। মনোনয়ন নিজেদের ঘরে আনতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিবাচক সংবাদ ভাইরাল করছেন তারা। অপরদিকে বিএনপিÑজামায়াত নিরবে অন্তরালে কাজ করে যাচ্ছে।

তথ্য রয়েছে জামায়েতের কেন্দ্রীয় নেতারা ইতো মধ্যে কয়েক দফা সাঁথিয়ায় এসে রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন নেতা কর্মীদের। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে কোন ধরণের বর্তা পাওয়া মাত্রই মাঠে নামতে হবে মর্মে অবগত করা হয় নেতা কর্মীদেরকে বলে নির্ভর যোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

৩ লাখ ৭৪ হাজার ভোটারের পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছেন বিভিন্নদলের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতারা। একটি বিষয় লক্ষণীয়, স্বাধীনতার পর এ আসন থেকে যিনি বিজয়ী হয়েছেন সেই দলই সরকার গঠন করেছে এবং নির্বাচিত প্রার্থী সরকারের মন্ত্রীত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। ১৯৭০ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ নৌকা প্রতিক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে সময় তিনি বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আন্যতম সদস্য ছিলেন এবং পাবনার গভর্নর নিযুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচনে মির্জা আব্দুল হালিম নির্বাচিত হয়ে জিয়াউর রহমান সরকারের নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মেজর (অবঃ) মনজুর কাদের নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মেজর (অবঃ) মনজুর কাদের নির্বাচিত হয়ে পানি উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সেক্রেটারী জেনারেল মওলানা মতিউর রহমান নিজামী বিজয়ী হন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে আসা মেজর (অবঃ) মনজুর কাদের নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ সামান্য ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন বিএনপি’র মনজুর কাদের। ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চার দলীয় জোটের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বিজয়ী হয়ে জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ্যাড. শামসুল হক টুকু নির্বাচিত হয়ে প্রথমে বিদ্যুত, খনিজ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয় এবং পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে পরাজিত করে আওয়ামীলীগ প্রার্থী এড. শামসুল হক টুকু বিজয়ী হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পাবনা-১ আসনের নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা করছেন পথসভা, উঠোন বৈঠক, মোটরসাইকেল শোডাউন, র‌্যালী এবং জনসভা। এবার আ.লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। সংস্কারপস্থী হওয়ায় গত দু’টি সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসনে মনোনয়ন পাননি। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট শামসুল টুকু নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে এমপি ছিলেন। তিনিও এ আসন থেকে এমপি’র মনোয়ন পেতে আশাবাদী। এ আসনে আ.লীগের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন সাঁথিয়ার যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন।

নিজাম উদ্দীন বলেন, যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি আশাবাদী। কিছুদিন আগে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে এসেছেন বলেও জানান।

এ আসন হতে প্রার্থী হওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন অধিক ভোটার অধ্যুষিত উন্নয়নবঞ্চিত সাঁথিয়ার আরেক সন্তান, তরুণ সমাজসেবক কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী কল্যাণ পরিষদের সহ-সভাপতি শিল্পোদ্যোক্তা ওবায়দুল হক। এ আসনে আ.লীগের অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন সাঁথিয়া পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান মরহুম মোজাম্মেল হক মাষ্টারের ছেলে সাবেক ছাত্রনেতা মোশারফ হোসেন স্কাই। তিনি এলাকাতে ব্যানার, ফেস্টুন এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের প্রার্থীতা জানান দিচ্ছেন।

এদিকে, এ আসনের বিএনপি’র প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব:) মনজুর কাদের ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জোটগতকারণে সিরাজগঞ্জের চৌহালী এলাকা থেকে নির্বাচন করায় এবং গত তিনটি নির্বাচনে বিএনপি’র কোন প্রার্থী না থাকায় এখানে বিএনপি’র শক্তিশালী কোন প্রার্থী হয়ে ওঠেনি। বলা যায়, বিএনপি অনেকটা নেতৃত্ব সংকটেই রয়েছে। তারপরেও প্রায় বারো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি থেকে এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি তাঁতীদলের সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ¦ ইউনুস আলী। যিনি এলাকাতে হাজী ইফনুছ বলে পরিচিত। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক বর্তমানে কারাবন্দী শামসুর রহমান। মহাজোটে থাকার কারণে গত দুই নির্বাচনে এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে কেউ প্রার্থী হননি। তবে এবার জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি সরদার শাজাহানের নাম শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, জামায়াতের আমীর ও সাবেক মন্ত্রী যুদ্ধাপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ম্ওালানা মতিউর রহমান নিজামীর বড় ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মমিনের নামও মানুষের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে। জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, যদি জোটগতভাবে নির্বাচন হয়, তাহলে পাবনা-১ আসন ছেড়ে দিবে ২০ দলীয় জোটের শরীক জামায়াতে ইসলামীর জন্য। সে হিসেবে নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার মমিন প্রার্থী হবেন বলে তাদের ধারণা। তবে এখনও কোন দলেরই প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় সবাই চিন্তিত রয়েছেন। যারযার আবস্থান থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোনয়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে। তবে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হবার পর অনেকটাই বদলে যেতে পারে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীতার দৃশ্যপট। অনেকের ধারণা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হওয়ায় কে পাবে এআসনটি থেকে আওয়ামীলীগের বিপরীতে ঐক্যজোটের টিকেট তা এখন দেখার বিষয়।

তবে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী দুই প্রার্থী মধ্যে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ড. আবু সাইয়িদ এলাকায় না আসায় এবং বর্তমান এমপি শামসুল হক টুকুর শক্ত প্রতিপক্ষ মাঠে না থাকায় নির্বাচন কেন্দ্রীক শোডাউন ও প্রচার প্রচারণা রয়েছে কম। এতে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের মধ্যে নির্বাচনী উৎসহ কিছুটা হলেও বটা পড়েছে। অন্য দিকে পাবনা-১ আসনে বিএনপি দলীয় উল্লেখযোগ্য প্রার্থী না থাকায় ও নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার আব্দুল মমিন এলাকায় না থাকায় সমর্থকরা নির্বাচনী কাজ থেকে বিরত রয়েছে। অন্য আসনের তুলনায় পাবনা-১ আসনে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা কম থাকায় সাধারণ ভোটাররা রয়েছে নিরব নেই তাদের মাঝে নির্বাচন কেন্দ্রীক উৎসাহ আনন্দ।

Leave a comment

আরও খবর

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩টি আসনে নৌকা চান ৪৪ জন
  • রাজশাহীতে নৌকায় চড়তে চাইছেন ৪৫ জন
  • রাজশাহীতে ভোটে লড়তে চান এক ডজন নারী
  • মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেন টমি
  • রাজশাহী-১ আসনে নৌকার প্রার্থী হতে চান ১০ নেতা
  • পাবনা-১ আসন, হতাশ বিরোধীরা
  • পাবনা-২ আসনে মনোনয়ন সংগ্রহ করলেন সবুজ
  • আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার বুধবার
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে ওদুদের পক্ষে মনোনয়নপত্র উত্তোলন
  • রাজশাহী সদর আসনে প্রার্থী হতে চান যারা
  • রাজশাহী বিভাগে আ.লীগ-বিএনপির প্রার্থী হতে পারেন যারা
  • মনোনয়ন জমা দিলেন এমপি দারা
  • রাজশাহী-৬ আসনে রায়হান-লাভলু-আক্কাসের মনোনয়ন সংগ্রহ
  • নওগাঁ-৪ আসনে উত্তপ্ত ভোটের মাঠ
  • বগুড়া-৫ আসনে মাঠে সক্রিয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা


  • উপরে