সঞ্চয়পত্র কিনতে লাগবে টিন ও এনআইডি

সঞ্চয়পত্র কিনতে লাগবে টিন ও এনআইডি

প্রকাশিত: ০৪-০২-২০১৯, সময়: ১০:৩৮ |
Share This

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : সঞ্চয়পত্র কেনার সময় ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)-এর ফটোকপি জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এই দুটি সনদের মাধ্যমে সংযোগ সৃষ্টি করে গড়ে তোলা হবে একটি ডাটাবেজ (তথ্যভাণ্ডার)। এটি ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের শনাক্ত ও টাকার উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

রোববার অর্থ বিভাগের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সঞ্চয়পত্রে অপ্রদর্শিত আয়ের বিনিয়োগ ও অস্বাভাবিক বিক্রির লাগাম টানতেই মূলত এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, এখন থেকে অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম। এতে সুবিধাভোগীরা ঘরে বসেই মুনাফার তথ্য পাবেন মোবাইল ফোনে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সব সুবিধাভোগীকে এর আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রে কালো টাকা বিনিয়োগ রোধে ৫০ হাজার টাকার বেশি কেউ সঞ্চয়পত্র কিনতে চাইলে তাকে চেকের মাধ্যমে টাকা পেমেন্ট করতে হবে। প্রাথমিকভাবে অনলাইন পদ্ধতি চালু হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখায়, সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায়, জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের ব্যুরো অফিস (গুলিস্তান) এবং বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের প্রধান কার্যালয়।

উল্লিখিত সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট) হাবিবুর রহমান রোববার বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুবিধা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে দেশের অনেক বড় গ্রুপও বিনিয়োগ করেছে সঞ্চয়পত্রে। যে কারণে অস্বাভাবিকভাবে বিক্রি হচ্ছে সঞ্চয়পত্র। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্র খাতে অনলাইনভিত্তিক সব উদ্যোগ প্রথমে পাইলট কর্মসূচি হিসেবে শুরু করা হয়েছে। এটি আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করবে।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণ করতে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ২৬ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়। সঞ্চয়পত্র অধিদফতের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে ২৫ হাজার কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এ হিসাবে অর্থবছরের অর্ধেক সময়েই সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সমান অর্থ ধার করে ফেলেছে সরকার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।

জানা গেছে, অতিমাত্রায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হওয়ায় সরকারকে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। এই সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা সৃষ্টি করছে বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যে কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টেনে ধরতে নেয়া হয়েছে উল্লিখিত সিদ্ধান্ত।

সূত্রমতে, ঋণ ও নগদ অর্থপ্রবাহের গতিবিধি নিয়ে প্রতি তিন মাস অন্তর অর্থ মন্ত্রণালয়ে নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ বৈঠকে সঞ্চয়পত্র খাতে অধিক বিনিয়োগের বিষয়টি উঠে আসে। ওই বৈঠকে সঞ্চয়পত্র অস্বাভাবিক হারে বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ঋণ ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যা হিসেবে মনে করা হয়। কারণ সরকার এ খাত থেকে অর্থের জোগান নিলেও এ ক্ষেত্রে ঋণ নেয়ার বিষয়টি সরকারের নয়, ক্রেতার ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য ওই বৈঠকে জাতীয় সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনা আধুনিয়কায়ন করতে এনআইডি ও টিআইএন সার্টিফিকেট ডাটাবেজে লিংক করতে নির্দেশ দেন অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার। এরপর থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, নির্বাচন কমিশনার ও সঞ্চয়পত্র অধিদফতর যৌথভাবে ডাটাবেজ তৈরি করতে কাজ শুরু করে। টিআইএন এবং এনআইডি লিংক পেতে সমঝোতা হয় এনবিআর এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর থেকে এ লিংক করে করে ডাটাবেজ নির্মাণ করা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মতে, সঞ্চয়পত্র সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। যে কারণে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু এ খাতে বিনিয়োগের কোনো উৎস চিহ্নিত করা বা যাচাই-বাছাই করার কোনো সুযোগ এ মুহূর্তে নেই। ফলে এখানে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা সেটি নিয়েও সন্দেহ থাকছে। তবে এখন ডাটাবেজ তৈরির ফলে ক্রেতার টিআইএন এবং এনআইডি লিংক হবে। এতে সহজে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা সেটি শনাক্ত করা যাবে।

জানা গেছে, সরকারের ঋণ নেয়ার একটি অন্যতম উৎস হচ্ছে সঞ্চয়পত্র খাত। কিন্তু সরকার এ খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করলেও এটি নির্ভর করে সাধারণ মানুষের ওপর। কারণ আজকে কত টাকার সঞ্চয়পত্র বেচাকেনা হবে সেটি সরকারও জানে না। ফলে এ খাত পুরোটাই নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের ওপর। পাশাপাশি ব্যাংকের আমানতের সুদের হার কমে যাওয়া, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব ও বিদ্যমান করনীতির কারণে সঞ্চয়পত্রের দিকে সাধারণ মানুষ ঝুঁকছে। এ কারণেই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এটি শেষ পর্যন্ত সরকারের অর্থনৈতিক খাতে সমস্যার সৃষ্টি করছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদহার সবচেয়ে বেশি নির্ধারণ করছে। মূলত সমাজের পেনশনভোগী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে এখান থেকে সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সুদ দেয়া হচ্ছে। এই সুবিধা আদৌ প্রকৃত জনগোষ্ঠী পাচ্ছে কিনা তা শনাক্ত করা হবে। কারণ এ খাতে কর্পোরেট বিনিয়োগ বেড়ে গেছে। যা সরকারের কাম্য নয়। কিন্তু সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, বর্তমানে বছরে এ ঋণের সুদ বাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বছরে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় তার থেকেও এ ব্যয় এক হাজার কোটি টাকা বেশি। তাই শিগগির সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের লাগাম টানতে চায় সরকার। এ জন্য এ খাতে বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।




উপরে