বাজার সামলাতে ব্যস্ত সরকারের ১২ সংস্থা, তবু অস্বস্তিতে ক্রেতারা

বাজার সামলাতে ব্যস্ত সরকারের ১২ সংস্থা, তবু অস্বস্তিতে ক্রেতারা

প্রকাশিত: ১৮-০৫-২০১৮, সময়: ১২:০৮ |
Share This

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : রমজান উপলক্ষে নিত্যপণ্যের বাজার সামলাতে কাজ করছে সরকারের ১১ সংস্থা। এই ১১ সংস্থার প্রায় ৩০-৩৫টি টিম প্রতিদিন বাজার মনিটর করছে। অনিয়ম দেখলে ব্যবস্থাও নিচ্ছে। সরকারকে বাজার পরিস্থিতির ওপর প্রতিবেদনও দিচ্ছে এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু তাতেও স্বস্তি নাই ক্রেতাদের। ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে ঠিকই মুনাফা লুটে নিচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। তারা বলছেন, এসব সংস্থার নির্দেশ অনেকেই মানছে না। কখন কোন সংস্থা কোন নির্দেশ দিচ্ছে, তা কে মানছে আর কে মানছে না, তা তদারকির কেউ নাই। এদিকে ব্যবসায়ীরা সরকারি পর্যবেক্ষকদের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন।

বাজার সামলানোর কাজে ব্যস্ত সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর ও সিটি করপোরেশন। এর বাইরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও দেশব্যাপী জেলা প্রশাসন প্রতিনিয়ত বাজার মনিটর করছে। একইসঙ্গে বাজারে আগে থেকেই কাজ করছে সরকারের চারটি গোয়েন্দা সংস্থা। এ সব সংস্থার গঠিত পৃথক পৃথক টিম প্রতিদিনই খোজ খরব নিচ্ছে নিত্যপণ্যের মূল্য, সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতির। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধিনস্ত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বাজারে মূল্য পরিস্থিতি ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি নিত্যপণ্য (মসুর ডাল, সয়াবিন তেল, চিনি, খেজুর ও ছোলা) বিক্রি করছে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকৃতভাবে এসব সংস্থার কোনটিরও বাজারের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কাজ নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিম প্রতিদিনই বাজারে যায়। একজন উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত এই মনিটরিং টিম নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি দেখে প্রতিদিনই বাণিজ্যমন্ত্রী ও সচিবের কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনও দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও জাল-জালিয়াতি হয় কিনা সেদিকে নজর রাখে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিভিন্ন প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ে এই দাম লেখা আছে কি না, বা এর বেশি দাম নিচ্ছে কিনা বা উৎপাদন ও ব্যবহারের মেয়াদ ঠিক মতো আছে কিনা বা কেউ কোনও পণ্যে ভেজাল দিচ্ছেন কিনা তা দেখভাল করে। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন র‌্যাব, পুলিশ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। এছাড়া সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর টিম বাজারের বিভিন্ন প্রকার নিত্যপণ্য আমদানি, সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, যাতে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের এসব সংস্থা গঠিত সব টিম ঠিকমতো বাজার পর্যবেক্ষণ করে না। করলেও এর কোনও সুবিধা পান না ক্রেতারা। কারণ ব্যাখ্যা করে ক্রেতারা জানান, এ সব সংস্থার নির্দেশ অনেকেই মানে না। কখন কোন সংস্থা কোন নির্দেশ দিচ্ছে, তা কে মানছে আর কে মানছে না, তা তদারকির কেউ নাই।

উদাহরণ দিয়ে শাহজাহানপুরের বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘গরুর মাংসের দাম রমজানে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হবে এমন নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশন। কিন্তু শাজাহানপুরের খলিলের মাংসের দোকোনে কখনোই সিটি করপোরেশন নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি হয় না। বাজারে যখন গরুর মাংসের দাম ৫০০ টাকা, তখন খলিলের দোকানে সাড়ে ৫০০ টাকা। আবার বাজারে যখন সাড়ে ৫০০ টাকা খলিলের দোকানে তখন ৬শ টাকা। নানা অজুহাতে এখানকার মাংস বিক্রি হয় বাজারের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেশি দরে। প্রকাশ্যে রাস্তার পাশেই এখানকার গরুর মাংস বিক্রির ক্ষেত্রে এতো অনিয়ম হলেও কিন্তু দেখার কেউ নাই।’

কিছুদিন আগে যখন পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায় তখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ঢাকায় পেঁয়াজের পাইকারি আড়তগুলোয় অভিযান পরিচালনা করে কয়েকটি নির্দেশনা দেয়। এর মধ্যে পেঁয়াজের বস্তার গায়ে দাম ও পরিমাণ লেখার নির্দেশ ছিল। এখনও পর্যন্ত এই নির্দেশনা মানছেন না পেঁয়াজের ব্যবসায়ীরা।
নিত্যপণ্যের বাজার (ছবি: ফোকাস বাংলা)

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব, যিনি মনিটরং টিমেরও প্রধান, তিনি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘খুচরা বাজার বা দোকানে মনিটরিং করা খুবই কঠিন। মূল্যের হেরফেরের ক্ষেত্রে বড় ধরণের অনিয়মটি হয় খুচরা বাজারে। যেখান থেকে ভোক্তারা পণ্য কেনেন। খুচরা বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এক সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল যে প্রত্যেক খুচরা ব্যবসায়ীকে পাইকারি বাজার থেকে কেনা পণ্যের ভাউচার প্রকাশ্যে রাখতে হবে। যাতে যে কেউ বুঝতে পারেন, খুচরা বিক্রেতা কতো দামে কেনা পণ্য কতো দামে বিক্রি করছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কেউ মানেননি।’

সিটি করপোরেশন সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, বাজারের প্রবেশ মুখে নিত্যপণ্যের প্রতিদিনকার পণ্যমূল্যের তালিকা বোর্ডে টানাতে হবে। একইভাবে প্রতিটি দোকানের সামনেও এর একটি মূল্য তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখতে হবে। কয়েকদিন কিছু ব্যবসায়ী এ নির্দেশনা মানলেও এখন আর কোনও দোকানদার তা মানেন না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাওরানবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী শুক্কুর ট্রেডার্সের মালিক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সে নির্দেশ মেনেছি। কিন্তু অনেক ব্যবসায়ীই এই নির্দেশ মানেননি। যারা এই নির্দেশ মানেননি, তাদের এই বিষয়টি কেউ দেখতেও আসেন না। এ রকম নানা ধরণের সিদ্ধান্ত হয়। রেডিও-টেলিভিশনে দেখি। সংবাদপত্রেও পড়ি। ওই টুকুই। এর বেশি কিছু তো দেখি না।’

রাজধানীর শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী রমজান আলী বলেন, ‘অনেক সময় পণ্যের মজুদ পরিস্থিতি দেখতে বাবসায়ীদের গুদাম পরিদর্শনে আসেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তারা এ সময় গুদামের পণ্য দেখে নানা রকমের হয়রানি করেন। কী পরিমাণ ও কোন পণ্য কতো দিন গুদামে রাখা যায় সে সম্পর্কে অনেকেরই প্রাথমিক ধারণা পর্যন্ত থাকে না। তাই এ নিয়ে বেশিরভাগ সময় আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নানা ধরণের বিরোধে জড়িয়ে পড়তে হয়। এতে অনেক ব্যবসায়ী হয়রানির শিকার হন।’

পণ্যের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে রাজধানীর শ্যামবাজারের মুদি ব্যবসায়ী হাসান ট্রেডার্সের মালিক খোরশেদ আলম বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীদের দোষ দেয় সবাই। কিন্তু এটা ঠিক না। দেশে কোনও পণ্যের ঘাটতি নাই। সরবরাহেও কোনও সমস্যা নাই। সব কিছুই স্বাভাবিক। তার পরেও অস্থিরতা নিয়ে বাজারে আসেন ক্রেতা। ক্রেতার হাবভাব দেখে মনে হয়, বাজারে সব পণ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিনতে না পারলে না খেয়ে মরতে হবে। অনেক সময় ক্রেতারা দাম দর জিজ্ঞেস না করেই অতিরিক্ত পরিমাণের পণ্যের অর্ডার দিতে থাকেন। এক কেজির স্থলে দুই কেজি। দুই কেজির স্থলে ৫ কেজি। ৪ কেজির স্থলে ১০ কেজি পরিমাণের পণ্য কেনেন। এতে বাজারে একটি বাড়তি চাপ পড়ে। বাজারে পণ্য সরবরাহের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। এ কারণেই অনেক সময় সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। আর এই সুযোগটি গ্রহণ করে কেউ কেউ। তবে এর জন্য সব ব্যবসায়ীকে অনৈতিকতার দায়ে দায়ী করা ঠিক নয়।’

এ প্রসঙ্গ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘বাজারে কোনও পণ্যের ঘাটতি নাই। রমজানে প্রয়োজনীয় সব পণ্যের অতিরিক্ত মজুদ রয়েছে। সব পণ্যের দামই ক্রেতার নাগালের মধ্যে রয়েছে। সরকারের একাধিক টিম বাজার মনিটর করছে। আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে যাতে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে।’

Leave a comment

আরও খবর

  • ইফতার নিয়ে পথচারি রোজারদের পাশে বেন্টু
  • বিএনপি নির্বাচনে না এলেও গণতন্ত্র অব্যাহত থাকবে: কাদের
  • নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১
  • কচুয়ায় নিয়ন্ত্রন হারিয়ে টমটম চালকের মৃত্যু
  • শিবগঞ্জে ট্রলি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিহত ১
  • রাজশাহীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ১১১
  • তিন মামলায় খালেদার জামিন আবেদন
  • ঈদের আগেই নতুন চেহারায় সকল মহাসড়ক
  • গাজীপুর নির্বাচনে প্রকাশ্যে বিএনপির হুমকি!
  • পুঠিয়ায় স্কুল ছাত্রীর বিষপানে আত্মহত্যা
  • নৌকার বিজয়ে প্রথম কান্ডারি হবে যুবলীগ : শাহরিয়ার
  • রহমত-বরকত-মাগফিরাতের মাস রমজান
  • সৌদিতে নারীদের ড্রাইভিংয়ের অধিকার নিয়ে আন্দোলন, গ্রেপ্তার ৫
  • কিউবায় বিধ্বস্ত বিমানের একটি ব্ল্যাক বাক্স মিলেছে, নিহত ১১০
  • ‘খুলনার দ্বিগুন ব্যবধানে রাজশাহীতে আ.লীগের মেয়র হবে’


  • উপরে