৪৮ বছর পর চৌহালীতে মর্যাদা পেল বৈন্যা গনকবর

৪৮ বছর পর চৌহালীতে মর্যাদা পেল বৈন্যা গনকবর

প্রকাশিত: ০৫-১২-২০১৯, সময়: ১৬:৩৪ |
Share This

স্বপন মির্জা, সিরাজগঞ্জ : ৭১-এর বাংলার মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধে যাদের আত্বত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকার স্বাধীনতা। সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার সেই মহান শহীদদের জঙ্গল ঘেরা বৈন্যা গণকবরটি পরিস্কার করে সবার বিনম্র শ্রোদ্ধা নিবেদনের জন্য সংরক্ষন করা হয়েছে।

দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছর পর উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক সরকার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেওয়ান মওদুদ আহমেদের উদ্যোগে প্রাথমিক ভাবে শহীদদের নাম সংবলিত একটি ফলক স্থাপন করা হয়েছে। শহীদদের এ কবরটি পুর্ণ মর্যাদায় সংরক্ষন করে এখানে একটি স্থায়ী ফলক নির্মানের উদ্যোগ নিয়েছে তারা। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি শহীদদের সম্মান জানাতে তাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে শহীদদের পরিবার ও এলাকাবাসী।

শহীদ পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, দেশ মাতৃকার টানে পাক হানাদার রুখতে ১৯৭১ সালে চলা মুক্তিযুদ্ধের সময় সেদিন ছিল ২৫ অক্টোবর। তখন পাক হানাদার বাহিনী চৌহালী উপজেলার বৈন্যা গ্রাম সহ আশ পাশ এলাকায় অবস্থান সাধারন মানুষ দুলাল সরকারের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। সে সময় স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পাক বাহিনী চারদিক থেকে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। ভয়ে আশ্রয় নেয়া অনেকেই পালিয়ে যায়।

এর মধ্যে মৃত ওছমান গনির ছেলে শহীদ হারুন অর-রশিদ, মৃত সোনাউল্লাহ বেপারীর ছেলে কুজরত আলী, জুড়ান আলীর ছেলে আব্দুল লতিফ, আব্দুস ছাত্তার, মামুদ আলী বেপারীর ছেলে নৈয়ম উদ্দিন মুন্সী, আলী হোসেন সরকারের ছেলে আব্দুল মিয়া, কছের উদ্দিন সরকারের ছেলে আব্দুস সামাদ মিয়া, মীর আলী বেপারীর ছেলে মনের উদ্দিন বেপারী, ছামু বেপারীর ছেলে আব্দুল কদ্দুস ছেলে, জাবেদ আলী ফকিরের ছেলে আবু ফকির, মকবুল হোসেন এর ছেলে নেরু সেখ, শ্রী যোগিন্দ পাটনি, নুর মোহাম্মদ বেপারীর ছেলে শাহজাহান আলী, আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুস ছাত্তার ধরা পড়ে। এদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।

এক পর্যায়ে সকলকে গুলি করে হত্যার পর লাশ গুলো একত্রিত ভাবে পুতে রাখা হয় গ্রামের মাঝ দিয়ে যাওয়া রাস্তার বাম পাশের জঙ্গলে। দীর্ঘদিন গণ কবরটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে শহীদদের স্বজনেরা কবরটির সন্ধান পেলে নিজেদের উদ্যোগে ১৪ জনের গণ কবরটি কছুটা সংরক্ষন করেন। এরপর বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জঙ্গল ও আগাছা পরিস্কার করা হয়। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক ভাবে মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক সরকার এবং ইউএনও দেওয়ান মওদুদ আহমেদ গন কবরে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাদের অস্থায়ী ফলক স্থাপন করেন। এতে ১৪ শহীদের নাম লেখা রয়েছে। এরপর তাদের আত্ত্বার শান্তি কামনায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

এ ব্যাপারের শহীদ পরিবারের সদস্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাবলু, মুকুল সরকার, নায়েব আলী জানান, দীর্ঘ দিন পরে হলেও উপজেলা প্রশাসন শহীদদের গনকবর সংরক্ষনে উদ্যোগ গ্রহন করায় আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা চাই এই গণকবরকে ঘিরে এখানে যেন একটি শহীদ মিনার নির্মান এবং ২৫ অক্টোবর বৈন্যা গ্রামে শহীদ দিবস পালন করা হয়।

এদিকে এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হজরত আলী মাষ্টার, ইউসুফ আলী হাক্কানী, জসীম উদ্দিন এবং আওয়ামীলীগ নেতা মাসুম শিকদার জানান, গনকবরটি দীর্ঘদিন পরিত্যাক্ত অবস্থায় ছিল। বর্তমানে তা সংরক্ষনের উদ্যোগ নেয়ায় শহীদদের আত্ত্বা যেমন শান্তি পাবে। তেমনি নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারনা পাবে।

এদিকে চৌহালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক সরকার ও চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেওয়ান মওদুদ আহমেদ বলেন, বিগত সময়ে সঠিক অনুসন্ধানের অভাবে গণ কবর সন্ধান না পাওয়া গেলেও আমরা বৈন্যা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের সহযোগীতায় খুঁজে পেয়েছি৷গনকবরটি সরকারীভাবে আমাদের দেখা শোনা করতে আমাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখানে একটি স্থায়ী ফলক সহ শহীদ মিনার নির্মান করার জন্য নকশা তৈরী করা হয়েছে। আশা করছি আগামী বছরে তা নির্মান করা হবে। এছাড়া জাতীয় দিবসে শহীদদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রোদ্ধা নিবেদন বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

উপরে