ট্রেনের লেভেল ক্রসিং দূর্ঘটনা রোধে স্বয়ংক্রিয় অটো সিগনাল ট্রান্সমিটার আবিষ্কার!

ট্রেনের লেভেল ক্রসিং দূর্ঘটনা রোধে স্বয়ংক্রিয় অটো সিগনাল ট্রান্সমিটার আবিষ্কার!

প্রকাশিত: 17-11-2019, সময়: 13:54 |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, নাটোর : সম্প্রতি ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার কসবা ও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর উদ্বেগের মধ্যে আছে দেশের মানুষ। ভ্রমণের জন্য এ বাহনটিকে নিরাপদ মনে করা হলেও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অবহেলা, লাইনের ত্রুটি, অনিরাপদ লেভেলক্রসিংসহ বিভিন্ন কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না।

এমন সময় লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা রোধে সুখবর দিলেন নাটোরের মনোয়ার হোসেন মিঠু। অটো সিগন্যাল ট্রান্সমিটার নামে একটি যন্ত্র উদ্ভাবনের দাবি করেছেন এ যুবক। যন্ত্রটি লেভেলক্রসিংয়ের বারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওঠা-নামা করাবে। মনোয়ার নাটোরের সিংড়া পৌরসভার গোডাউনপাড়া এলাকার মৃত রওশন আলীর ছেলে। তিনি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বগুড়া কার্যালয়ে মিটার রিডার হিসেবে কর্মরত। কাজের অবসরে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের আগাম সিগন্যাল আবিস্কারে কাজ করেন বলে তিনি জানান।

মনোয়ার হোসেন মিঠুর দাবী করেছেন ,তার আবিস্কৃত প্রযুক্তির অটো সিগনাল ট্রান্সমিটারটি স্বয়ংক্রিয়। এই স্বয়ংক্রিয় অটো সিগনাল ট্রান্সমিটারে লেভেল ক্রসিংয়ে সিগনাল ডাউন দিতে কোন জনবল লাগবেনা। জনবল ছাড়াই স্বয়ংক্রিয় এই অটো সিগনাল ট্রান্সমিটারের মাধমে লেভেল ক্রসিংয়ের বেরিয়ার ওঠা-নামা করবে। ট্রেন আসার ৫ থেকে ৭ মিনিট আগেই স্বয়ংক্রিয় অটো সিগনাল ট্রান্সমিটার নেমে যাবে এবং ট্রেন চলে যাওয়ার সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয় সিগনাল ঊঠে যাবে।

নতুন যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করবে? মনোয়ার বলেন, যন্ত্রটি ট্রেনের সঙ্গে লাগানো থাকবে। এটি লেভেলক্রসিংয়ের বারের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবে। ক্রসিংয়ে ট্রেন পৌঁছানোর পাঁচ-সাত মিনিট আগেই যন্ত্রটির সংকেত পেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ক্রসিংয়ের বারটি নেমে যাবে। ট্রেন চলে যাওয়ার পর সেটি আবার উঠে যাবে। এক্ষেত্রে মানুষের কোনো সাহায্য লাগবে না। ফলে লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে। যন্ত্রটি ব্যবহারে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

তিনি বলেন,রেলের এই প্রযুক্তি আবিস্কারের পাশাপাশি মহাসড়কের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতেও তিনি কাজ করছেন। সরকারী সেবাখাত রেলওয়েকে আরো নিরাপদ ও আধুনিকায়নে তার আবিস্কৃত স্বয়ংক্রিয় অটো সিগনাল ট্রান্সমিটার ব্যবহারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন গবেষক মনোয়ার হোসেন মিঠু।

সিংড়া পৌরসভার গোডাউন পাড়া এলাকার মৃত রওশন আলীর ছেলে মনোয়ার হোসেন মিঠু এই প্রতিবেদককে আরও জানান, তিনি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বগুড়া কার্যালয়ে মিটার রিডার হিসেবে কর্মরত। কাজের অবসরে তিনি দুর্ঘটনা প্রতিরোধের আগাম সিগনাল আবিস্কারে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন,যাত্রীদের নিরাপদ বাহন ট্রেন। সারাদেশে দুই হাজার ৯২৯কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে মানসম্পন্ন রেললাইন মাত্র ৭৩৯ কিলোমিটার। দশ বছরে এক হাজার ৯৬১টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর এই ৯২৯কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার লেভেল ক্রসিং রয়েছে। অধিকাংশ দূর্ঘটনাই ঘটেছে লেভেল ক্রসিং গুলোতে। অরক্ষিত দুই হাজার ২৩৬টি লেভেল ক্রসিংয়ে নেই গেটম্যান।

ট্রেন দুর্ঘটনা রোধে তথ্য আদান প্রদান সহ লেভেল ক্রসিং ট্রান্সমিটার আবিস্কারে তিনি গত দশ বছর ধরে গবেষনা করে যাচ্ছেন। তার গবেষনার বিষয়সহ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য রেল কর্তৃপক্ষের সাথেও যোগাযোগ করেছেন। তারা তার প্রযুক্তি দেখে উৎসাহিত ও প্রশংসা করেছেন। ইতিপুর্বে তিনি “স্লিপার দুর্বৃত্তায়ন ও লাইনচ্যুতির” কারণে ট্রেন দূর্ঘটনা রোধেও ট্রান্সমিটার আবি¯কার করেন। তার সেই আবিস্কৃত যন্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে প্রসংশিত হয়। পরবর্তীতে তার আবিস্কৃত স্বয়ংক্রিয় অটো সিগনাল ট্রান্সমিটার বিষয় জানতে চলতি বছর ৭ জুলাই রাজশাহীস্থ পশ্চিমাঞ্চল রেলের তৎকালীন জিএম হারুন অর-রশিদ তাকে রাজশাহী ডেকে নেন। সেখানে তার আবিস্কৃত স্বযংক্রিয় অটো সিগনাল ট্রান্সমিটার পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা করে তারা শতভাগ সফলতা পান। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অদ্যাবদি বিষয়টি থমকে আছে।

নাটোর রেলওয়ে স্টেশন মাষ্টার অশোক চক্রবর্তী বলেন, কয়েকমাস আগে বিষয়টি লোকমুখে জানার পর মনোয়ার হোসেন মিঠুর সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করি এবং তাকে রেলের রাজশাহীস্থ পশ্চিমাঞ্চল অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিই। পরবর্তীতে তিনি আর আমার সাথে যোগাযোগ করেননি। জিএম হারুন অর-রশিদ বর্তমানে অবসরে রয়েছেন।

সিংড়া পৌর মেয়র জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সে রেলের কিছু একটা নিয়ে গবেষনা করছে। লেবেল ক্রসিংয়ের সিগনাল নিয়ে একটি যন্ত্র আবিস্কারের কথা শুনেছেন। তবে তিনি স্বশরীরে গিয়ে যন্ত্রটি দেখেননি। অবশ্য মিঠুর আবিস্কৃত প্রযুক্তির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য রেলের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এগিয়ে আসা দরকার।

এবিষয়ে জানতে রাজশাহীস্থ পশ্চিমাঞ্চল রেলের বর্তমান জিএম মিহির কান্ত গুহ’র সাথে তার সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রেলের কোন কিছু আবিস্কারের তিনি কিছুই জানেননা। তার সাথে কেউ যোগাযোগ বা তাকে অবগত করেননি।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সচিব মো. মোফাজজল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মিঠু তার আবিস্কৃত প্রযুক্তির বিষয়ে কথা বলেছে। একবার দেখাও করে গেছে। তার প্রযুক্তি কাজ করে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য রাজশাহীস্থ পশ্চিমাঞ্চল রেলের সিগনাল ও টেলিকমিউনিকেশন বিভাগে গিয়ে যোগাযোগ করা পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পাইলটিং করারও পরামর্শ দেন তিনি। তবে বর্তমান সিস্টেমের তুলনায় উন্নত প্রযুক্তি এবং টেকসই হিসেবে কাজ করবে এমন নিশ্চিয়তা পেলে রেল তা গ্রহন করবে। এজন্য আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মোহম্মদ শাহরিয়াজ বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে পররীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মিঠুর উদ্ভাবিত প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখতে হবে। বর্তমান সিস্টেমের তুলনায় উন্নত প্রযুক্তি এবং টেকসই হলে তার জন্য সব ধরনের সহায়তা করা হবে।

Leave a comment

উপরে