হাজতে আসামির মৃত্যু : ৬ পুলিশ প্রত্যাহার

হাজতে আসামির মৃত্যু : ৬ পুলিশ প্রত্যাহার

প্রকাশিত: 17-10-2019, সময়: 12:15 |
Share This

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : রংপুরে একটি পুলিশ ফাঁড়ির হাজতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর ছয় পুলিশকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বুধবার এ ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার বিকালে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান।

এরা হলেন, পীরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম, এসআই তাজউদ্দিন, পিএসআই মাহি আলম, এএসআই হরিকান্ত, কনস্টেবল আরিফুল ও ভুপেন।

গঙ্গাচড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুশান্ত সরকারকে সাময়িকভাবে ভেন্ডাবাড়ি ফাঁড়ি ইনচার্জের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে এসপি জানান।

বিকালে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসপি বিপ্লব আরও জানান, এ ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মারুফ হোসাইনের নেতৃত্বে তিন সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আগামী তিন দিনের মধ্য তাদের তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করতে বলা হয়েছে।

সকালে এই ফাঁড়িতে এক হাজতির মৃত্যু হয়েছে; যিনি ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশের ভাষ্য।

এদিক, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে এ ঘটনার পর এলাকাবাসী ফাঁড়ি ঘেরাও করলে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ হয়।

নিহত সামছুল ইসলাম (৫৫) রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে।

পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে ভেন্ডাবাড়ী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম তার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে পীরগঞ্জের বড়দরগাহ্ থেকে মাদক ব্যবসার অভিযোগে সামছুল ইসলামকে আটক করে নিয়ে আসেন। গভীর রাতে সামছুল ইসলাম নিজের পরনের শার্ট গলায় পেঁচিয়ে আত্যহত্যা করেন। পরদিন সকালে সামছুল ইসলামের বাড়ির লোকজন ভেন্ডাবাড়ি তদন্ত কেন্দ্রে এসে মৃত্যুর খবর পান।

তবে এর আগে পুলিশ বলেছিল, বুধবার সকালে তার স্বজনরা দেখা করে তাকে খাওয়ার দেন এবং পরনের ‘ফতুয়া’ গলায় দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন।

তবে সামছুলের পরিবারের সদস্যরা আত্মহত্যার কথা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, পুলিশ সামছুলকে হাজতে হত্যা করেছে।

নিহতের স্ত্রী মমেনা বেগম, মে সান্ত্বনা ও বোন ফাতেমা বেগম হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বলেন, সামছুল মাদকাসক্ত নয় এবং মাদক ব্যবসার প্রশ্নই আসে না। তিনি গরু-ছাগলের ব্যবসায়ী।

মমেনা বলেন, “মঙ্গলবার রাত ১১টায় শেষ সাক্ষাতের সময় আমাদের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন ফাঁড়ি ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম। দাবিকৃত টাকা না পেয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।”

এলাকাবাসী জানান, সামছুলের মৃত্যুর ঘটনা বুধবার সকালে এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে হাজারও নারী-পুরুষ পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তুলে শাস্তির দাবিতে ভেন্ডাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে পুলিশ ফাঁড়ি এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে ভেন্ডাবাড়ী-বড়দরগাহ সড়কটি উত্তেজিত জনতা অবরোধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্ধীরা জানান, এ সময় রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মারুফ হোসাইন দোষী পুলিশদের বিচারের আশ্বাস দিলেও অনড় অবস্থায় থাকে জনতা। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা পুলিশ ফাঁড়িতে ঢিল ছুঁড়লে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। জনতাও ঢিল ছুঁড়ে পাল্টা জবাব দেয়।

পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাল্টাপাল্টি আক্রমণে সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) হাফিজুর রহমানসহ ১২ পুলিশ, পথচারী ভিক্ষুক আব্দুল কাদের, বড়দরগাহ্ ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল হক, কাঠমিস্ত্রি আইয়ুব আলীসহ অর্ধশতাধিক জনতা আহত হয়। এক পর্যায়ে অবস্থানরত জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

আহতদের মধ্যে ৩০/৩৫ জনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। কে্উ কেউ স্থানীয়ভাবেও চিকিৎসা নিয়েছেন।

মিঠাপুকুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ হেফাজতে মৃত ব্যক্তির এলাকায় মাদক সংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। তিনি ব্যবসায়ী হিসেবেই পরিচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার অনেকেই বলেন, পুলিশ পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম পীরগঞ্জের ওসি সরেস চন্দ্রের মদদে দীর্ঘদিন যাবত ভেন্ডাবাড়ী ফাঁড়িতে আটক বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন। শুধু অভিযোগের নামে বিভিন্ন মানুষকে আটক করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছেন।

এ বিষয়ে ভেন্ডাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ (সদ্য প্রত্যাহার হওয়া) আমিনুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মারুফ হোসাইন বলেন, বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে আক্রমণ করলে পুলিশ শটগান দিয়ে আনুমানিক ৩৫ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে। সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

ঘটনার পরপরই পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিএমএ মমিন, আওয়ামী লীগের জেলা সাংস্কৃতিক সম্পাদক শাহিদুল ইসলাম পিন্টু, উপজেলা সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র তাজিমুল ইসলাম শামিম দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে।

পুলিশ জানায়, মৃত ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে চোলাই মদ ব্যবসার মামলা রয়েছে। এছাড়া মৃত্যুর পর ইউডি মামলা করে লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে।

উপরে