যমুনার তীরে সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিশ্বমানের চিকিৎসা

যমুনার তীরে সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিশ্বমানের চিকিৎসা

প্রকাশিত: 08-09-2019, সময়: 16:59 |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ : ‘সর্ব নিম্ন ব্যয়ে পৃথিবীর সর্বাধনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সর্বৎকৃষ্ট মানের সেবা’ এই শ্লোগানকে অবলম্বন করে মানবতায় কল্যানে প্রয়াত ডাঃ মীর মোহাম্মদ আমজাদ হোসেনের প্রতিষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে অলাভজনক খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল সেবা দিয়ে যাচ্ছে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত ধর্মীয় নেতা, ওলিয়ে কামেল হযরত শাহ সুফী খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ)-এর নামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে যমুনার তীর ঘেসে অনন্য স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত দেশের বৃহৎ এই চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে সমগ্র বাংলার মানুষ সুলভে সব রকম চিকিৎসা নিচ্ছে। ট্রাষ্টি এ প্রতিষ্ঠানে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের বিনা মুল্যে চিকিৎসার পাশাপাশি অতিদরিদ্র অসহায় মানুষের জন্যও রাখা হয়েছে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা। এ কারনে আর প্রচুর অর্থ খরচ করে জটিল-কঠিন রোগের চিকিৎসায় বিদেশ মুখী না হয়ে স্বল্প খরচে এ হাসপাতালেই প্রতিদিন ভীড় করছে দেশের হাজার-হাজার রোগীরা।

শাহান শাহে তরিকত, খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (রঃ) বেঁচে থাকা কালীন তার অনুসারীদের নিয়ে (বর্তমান হাসপাতাল এলাকা) যমুনা পাড়ে এসে ঘোষনা করে ছিলেন, অসুখ-বিসুখে বিনা চিকিৎসায় যাতে মানুষ মারা না যায়, সে জন্যে এখানে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান। আর তারই সে ঘোষনা বাস্তবায়নের জন্য বিটিএমসির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক চেয়ারম্যান, ড্রাক ইন্টার ন্যাশনাল লিমিটেডের এমডি প্রয়াত ডাঃ এম এম আমজাদ হোসেন খাজা এনায়েতপুরী (রঃ) নির্ধারিত স্থানে ১৯৯৬ সালে এনায়েতপুর গ্রামের দক্ষিন এলাকার খরস্রোতা যমুনা নদীর ভিতর নিজস্ব ৯০ একর জায়গার সিদ্ধান্ত নেয় খাজা ইউনুছ আলী (রঃ) নাম অনুসারেই একটি হাসপাতাল করার। তার পরের বছরেই যমুনা নদীর ৪০-৫০ ফুট গভীর জায়গা মাটি দিয়ে ভরাট করে প্রায় ২০০৩ সাল নাগাদ খাজা ইউনুছ আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের নির্মান কাজ শেষ হয়। সেখানে অনন্য স্থাপত্য শৈলীর সঙ্গে ল্যান্ডস্কেপিংয়ের নান্দনিকতার মিশলে সৃষ্টি হয়েছে ৫৬টি ভবনের মধ্যে ২২টি ভবন। যা দেশের স্থাপত্য শিল্পে এক অনবদ্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫৮৬ বেডের এ হাসপাতাল ভবন, সুবিশাল ইনডোর ভবন, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইন্সটিটিউিট, ক্যান্সার সেন্টার, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এন্ড কলেজ, ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা হোষ্টেল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাস ভবন, সুবিশাল আবাসিক হোটেল, আধুনিক মার্কেট সহ অন্যান্য স্থাপনা। এরপর বিশ্বমানের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সমৃদ্ধ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত, সম্পুর্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দেশের সর্ববৃহৎ এই অলাভজনক ট্রাষ্টি হাসপাতাল ২০০৩ সালের ১৭ মে আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করে। তখন দেশের মধ্যে অনেকটা প্রথম স্বল্প খরচে ওপেন হার্ট, বাইপাস সার্জারী সহ অন্যান্য জটিল-কঠিন রোগের অপারেশন সফল ভাবে সম্পর্ন করার সমগ্র দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রচুর অর্থ ও সময় ব্যয় করে সাধারন রোগীদের আর বিদেশ মুখী চিকিৎসায় ভরসা না করতে হওয়ায় মানুষ এ সেবা প্রতিষ্ঠানটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

এর মধ্যে গত ২০০৫ সালের মাঝামাঝিতে চালু করা হয় ক্যান্সার সেন্টার। এতে সম্পৃক্ত করা হয় বিশ্বের সর্বাধুনিক রেডিও থেরাপী মেশিন লিনিয়ার এক্সেলেরেটর, ব্রাকি থেরাপী মেশিন। যা তখন কার সময়ে দেশে প্রথম। এতে একজন রোগীর সম্পুর্ন দেহ চেকাপ করে নিখুত ভাবে নির্নয় হয় ক্যান্সার রোগ। সে অনুযায়ী রোগীর ক্যান্সার কোষকে দেহ থেকে ধ্বংস করা হয়। এ ক্যান্সার চিকিৎসায় দেশের মধ্যে খাজা ইউনুছ আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালই এখন পর্যন্ত সেরা বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রোগীরা। এতেও বহিঃ বিশ্বের চেয়ে এখানে রাখা হয় তুলনা মুলক স্বল্প খরচ।

হাসপাতালে কার্ডিওলোজী, মেডিসিন, সার্জারী, গাইনী, শিশু, অর্থপেটিক, আই, ইএনটি, চর্ম ও যৌন, ক্যান্সার, ডায়ালাইসিস, কিডনী ষ্টোন ক্রাস, গ্যাসটোলজিষ্ট, হেমাটোলজি, সাইক্রেটিক, ডায়বেটিক, নিউরো বিভাগে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এতে নিয়োজিত রয়েছেন দেশী-বিদেশী খ্যাতনামা দেড়শ চিকিৎসক ও ৩শ নার্স। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে বহিঃ বিভাগে সহস্রাদিক এবং ইনডোরে ২ শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে সকল ওয়ার্ডেই শতকরা ১৫ ভাগ হতদরিদ্র রোগীকে সম্পুর্ন বিনা খরচে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে এ পর্যন্ত অতিদরিদ্র প্রায় লক্ষাধিক রোগীকে বিনামুল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এছাড়া শিশুদের ও গর্ভবতী মাদের বিনামুল্যে চিকিৎসা এবং নাম মাত্র ৫০ টাকায় চক্ষু চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ এ্যাষ্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সাধারন সম্পাদক সৌখিন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী এফ আর সরকার জানান, আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছি। গিয়েছি অনেক বড়-বড় হাসপাতালে। সেখানে হাসপাতাল গুলো আসলে শহর ও রাজধানী নির্ভর। কিন্তু পৃথিবীর মধ্যে এটিই একটি বিরল চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান যা একটি গ্রামে অবস্থিত। তাও দেশের সর্ববৃহৎ এই হাসপাতাল। এটা আসলেই দরিদ্র নির্ভর। গ্রাম তথা দেশের সকল শ্রেনীর মানুষের কল্যানের কথা ভেবেই গড়ে তোলায় ডাঃ এম এম আমজাদ হোসেন ও তার পরিবার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। মানবতার কল্যানে নিবেদিত তাদের প্রতিষ্ঠানে সেবা নিয়ে মানুষ আজীবন তাদের স্মরণ করবে।

খাজা ইউনুছ আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের ৬ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রয়াত চেয়ারম্যান ডাঃ এম এম আমজাদ হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ ইউসুফ রয়েছেন পরিচালকের দায়িত্বে। আর পরিবারের অন্যান্য ৫ সদস্য রয়েছেন বোর্ডের সদস্য হিসেবে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ মানবীয় হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা তার পিতা ডাঃ এমএম আমজাদ হোসেন সম্পর্কে বলেন, দেশের মানুষের জন্য তার অঘাত ভালবাসা ছিল। দেশকে সমৃদ্ধ করতে জীবনে প্রতিটি পদক্ষেপে সফল হয়েছেন। খাজা বাবা ইউনুছ আলী (রঃ) দিক নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃত পক্ষে দেশের মানুষকে সুচিকিৎসা দেবার লক্ষ্যে আমার বাবা অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠান করেছেন। এটা আমাদের একার নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পদ। তিনি জানান, আমার বাবা মানুষের কল্যানের ব্রত নিয়ে যে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, আমরা তার দেখানো আলোর পথই অনুসরন করবো।

এদিকে মানব হিতৈষী কর্মবীর ডাঃ এমএম আমজাদ হোসেনের জীবনী সম্পর্কে জানা যায়, অঘাত সম্পদ থাকা সত্যেও তিনি ছিলেন ভোগ বিলাসী জীবনের বিরোধী। সাধারন জীবন যাপনে ছিলেন অতীত থেকেই আগ্রহী। আজীবন দেশ ও মানবতার কল্যানে কাজ করে গেছেন। পাকিস্থান সরকারের বাধা দমিয়ে তিনিই পাবনার ঈশ্বরদীতে আলহাজ্ব টেক্সষ্টাইল মিলস্ গড়ার দেশের প্রথম শিল্প উদ্যোক্তা। কয়েক বছর ছিলেন পাক সেনাবাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তা, বিটিএমসির চেয়ারম্যান, সিআইপি সহ অনেক ভারি শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশে আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদান ও শিক্ষা বিস্তারের অগ্রনায়ক। তিনি ১৯২৫ সালের ১ অক্টোবর জন্মগ্রহন এবং ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যু বরণ করেন।

উপরে