চৌহালীতে বেতনে নিয়েমিত কর্মস্থলে নেই কোন চিকিৎসক

চৌহালীতে বেতনে নিয়েমিত কর্মস্থলে নেই কোন চিকিৎসক

প্রকাশিত: ১১-০৬-২০১৯, সময়: ১৬:৩৮ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিররজিগঞ্জ : বেতন-ভাতা উত্তোলনে তাদের নিয়োমিত অংশগ্রহন। তবে কর্মস্থলে কাজের বেলায় ঠন ঠনাঠন। সপ্তাহে আসেন একবার আবার নাও আসেন তারা। এতে রোগী বাঁচুক আর মরুক তাদের কিছু যায় আসেনা। তাই সিরাজগঞ্জের যমুনা নদী দ্বারা জেলার বিচ্ছিন্ন অবহেলিত জনপদ চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির চিকিৎসকদের এমন দায়িত্ববোধের কারনে রোগীদের এখন অনেকটাই কোন কাজে আসছেনা। তারা কাঙ্খিত সেবা না পেয়ে দুর্ভোগ নিয়ে আশাহত হয়ে ফিরছে বাড়িতে। সোমবার দিনভর অফিস চলাকালিন অবস্থান কালে পাওয়া যায়নি কোন চিকিৎসক। এ কারনে চরাঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত অসহায় রোগীদের দুশ্চিন্তা কাটছেনা। মাসে কয়েক দিন এদের চোখে পড়ে এলাকাবাসীর। তাও নাকি তারা আসেন শুধু হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে।

সিরাজগঞ্জ জেলার ভুখন্ড হতে যমুনা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন জনপদ চৌহালী উপজেলার দুর্গোম চরাঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত-অসহায় মানুষকে ঝাড়-ফু ও কবিরাজের ভাওতাবাজী চিকিৎসা হতে মুক্তি দিতে ১৯৮৬ সালে সরকারী ভাবে নির্মান করা হয় ৩১ সজ্জার একটি আধুনিক হাসপাতাল। গত ২০১৪ সালে তা যমুনায় বিলীনে খাসকাউলিয়ায় স্থানান্তর করে এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে অতীতে যেভাবে চিকিৎসা সেবা পেয়েছে এখানকার মানুষ সে রকম আর নেই। রোগীদের ওয়ার্ড গুলো ব্যবহৃত হচ্ছে কর্মচারীদের শোবার ঘর ও কিচেন রুম হিসেবে। বেড গুলো ঘুমানোর জন্য ব্যবহার করছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মী, অফিস সহায়ক, চালক ও অন্যান্য কর্মচারীরা। ইনডোর চালু না থাকায় রোগীদের এসব সেবা নিচ্ছেন এই সুবিধাবাদী কর্মচারীরা।

এদিকে হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ৬ জন এমবিবিএস ডাক্তার। এর মধ্যে নিয়মিত নন একজনও। এরা হলো আরএমও ডাঃ আনন্দ মোহন সরকার, ডাঃ আশরাফুল ইসলাম, ডাঃ সোনিয়া রহমান সাথী-কনসালটেন্ট (গাইনী), ডাঃ আনিকা ছাত্তার, ডাঃ সুমন ও ডাঃ শাহিনুল আলম। সোমবার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে ৩ ঘন্টা অবস্থান নিয়ে দেখা যায়, কোন চিকিৎসকই কর্মস্থলে নেই। তারা এখানে দায়িত্ব পালন করেন খেয়াল খুশি মত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এলাকাবাসী জানায়, হাসপাতালের বেতন ভাতা ঠিকই নিয়ে তারা অবস্থান করেন বেসরকারী ক্লিনিক গুলোতে। আবার সপ্তাহে দু-একদিন আসলেও কোন রকমে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে ২-৩ ঘন্টা রোগী দেখেই চলে যায়। মুলত, তাদের তদারকিতে নিয়োজিত কর্মকর্তারা যথাযথ ভুমিকা না রাখায় এমন অবস্থা।

হাসপাতালের সপ্তাহিক কার্য তালিকায় সোমবারে উল্লেখ রয়েছে, সকালে সকল চিকিৎসকরা হাসপাতালে অবস্থানের কথা। এছাড়া সকাল থেকে রাতেও অবস্থান নেবেন ডাঃ আশরাফুল আলম। তবে তারা কেউ এদিন উপস্থিত হননি। কেন উপস্থিত হননি জানতে দন্ত চিকিৎসক ডাঃ আশরাফুল আলমের ব্যবহৃত ০১৬৮৪-০০৪০১৪ নম্বর মোবাইল ফোনে বার-বার ফোন করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে হাসপাতালে আরএমও ডাঃ আনন্দ মোহন সরকার জানান, ঈদের সময় আমার ছুটি থাকলেও কর্মস্থলে ছিলাম বলে এখন হাসপাতালে যাচ্ছিনা।
গাইনী চিকিৎসক ডাঃ সোনিয়া রহমান সাথীকে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি।

বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসক উপস্থিতি না থাকায় ৫টি মৌলিক চাহিদার অন্যতম চরাঞ্চলের অসহায় রোগীদের চিকিৎসা পেতে চড়ম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাদের বিশেষ চিকিৎসায় সুদুর টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপর নির্ভর করতে হয়। সোমবার চিকিৎসা নিতে আসা জাজুরিয়ার খাদিজাতুল কোবরা (২৬), বৃদ্ধ আমীর হোসেন (৫২), পুর্ব খাসকাউলিয়ার আবু সাইদ (৫৫) এবং খাস পুকুরিয়ার আবুল কালাম (৫৮) জানান, আমরা সবাই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু কোন চিকিৎসক পাইনি। হাসপাতালে যদি সরকার চিকিৎসক না রাখতে পারে তাহলে আমাদের জন্য তা করা হয়েছে কেন। তারা আরো জানান, আমরা যখনই আসি সব চিকিৎসককে পাইনা। আবার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে যে জানাবো তিনিও নিয়মিত উপস্থিত হননা। তাহলে কি আমরা চরবাসী চিকিৎসা পাবোনা।

এদিকে কোদালিয়া গ্রামের শতবর্ষী বৃদ্ধ মাঙ্গন আলী মোল্লা জানান, আমার প্রেসাব সমস্যা হওয়ায় হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু ডাক্তার নেই। এখন আমাদের উপায় হবে কি। উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা একটু দেখে ওষুধ দিয়েছে। তাই দিয়ে কি চলে। হাসপাতাল আছে ডাক্তার নাই তাহলে এটা থেকে আমাদের লাভ কি।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে ডাক্তারদের উপস্থিতি অনেকটা হ্রাস পাওয়ায় ২জন উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের উপর নির্ভর হয়ে পড়েছে। তারাও পুরো উপজেলার রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমসীম খাচ্ছে। এ ব্যাপারে উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডাঃ আনিসুর রহমান মামুন জানান, বর্তমানে রোগীর চাপ বেশি হলেও আমাদের হাসপাতালে সিনিয়র চিকিৎসকরা নিয়মিত সময় দিতে না পারায় আমরাও কুলিয়ে উঠতে পারছিনা। তবে সাধ্যনুযায়ী আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচএ ডাঃ আব্দুল কাদের জানান, দু একজন চিকিৎসক কিছু কারনে অনিমিত হওয়ায় আমি নিজেও অসন্তষ্ট। চৌহালীর মানুষ সরল আর অভাবী। এদের যদি আমরা সেবা দিতে না পারি তাহলে মহান এই পেশা কুলষিত হয়। চিকিৎসকরা যাতে আগামীতে কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করে সে লক্ষে আমি সচেষ্ট থাকবো।

উপরে