বাগাতিপাড়ায় নষ্ট হচ্ছে ইংরেজ নীলকরদের অভিশপ্ত নীলকুঠি

বাগাতিপাড়ায় নষ্ট হচ্ছে ইংরেজ নীলকরদের অভিশপ্ত নীলকুঠি

প্রকাশিত: ১১-০১-২০১৯, সময়: ১৬:৫৭ |
Share This

নবীউর রহমান পিপলু, নাটোর : ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজদের শোষন ও নির্যাতনের ইতিহাস কম বেশী অনেকের জানা। এই উপমহাদেশ থেকে বহু আগে ইংরেজদের পতন ঘটলেও তাদের শোষণ নির্যাতনের নানা স্মৃতি আজও রয়ে গেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ব্রিটিশ শাসনামলে নীল চাষের জন্য কৃষকদের ওপর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পাণীর নীলকর ইংরেজ সাহেবদের নির্যাতনের নির্মম স্মৃতি কালের স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার নওশেরা গ্রামের নীলকুঠিবাড়ি। অযত্ন ও রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়া এই নীলকুঠি বাড়িটি ধসে পড়ে ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে। ইতিপুর্বে ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে বাগাতিপাড়া সদর, পারকুঠি, নুরপুর কুঠি বাঁশবাড়ীয়া, চিথলিয়া এলাকায় ইংরেজ নীলকর সাহেবদের সময় তৈরি স্থাপনা। তাদের সময়কার অনেক সম্পদ এখন বেদখল হয়ে গেছে। তবে এখনও কালের স্বাক্ষী হিসেবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়া ধংস প্রায় নওশেরা গ্রামের নীল কুঠিবাড়ি সংস্কার সহ ইংরেজদের নির্মম নির্যাতন কাহিনী সংরক্ষন করার দাবী স্থানীয়দের।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, ব্রিটিশ শাসনের সময় ইংরেজরা বাগাতিপাড়ার নওশেরা, পারকুঠি, নুরপুর কুঠি বাঁশবাড়ীয়া, চিথলিয়া এলকায় কুঠিবাড়ী স্থাপন করে স্থানীয় নিরীহ বাসিন্দাদের দিয়ে জঙ্গলাকীর্ন জমি সমুহ পরিষ্কার করে নীলচাষের উপযোগী করে। আর কৃষকদের জোর পুর্বক নীল চাষে বাধ্য করা হত । কিন্তু কালের বিবর্তনে সে সময়ের স্থাপিত এ উপজেলার নীলকুঠিয়াল সাহেবদের অফিস-আদালত এবং নীল সংরক্ষণাগারসহ বহু স্থাপনা ভূমিকম্পে মাটির গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কিছু কিছু স্থানে এই নীল কুঠি ও কলকুঠিগুলির কিছু অংশ কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীলকুঠি তারই অংশ বিশেষ নীলকর ইংরেজ সাহেবদের ডাকবাংলো। আজও এসব এলাকায় রয়েছে অভিশপ্ত নীল চাষ-নীলকর আদায়কারী সাহেবদের নিয়ে আনা সাওতাঁল-বাগদীসহ বিভিন্ন আদিবাসী।

স্থানীয় শিক্ষাবীদ, রাজনৈতিক প্রবীণ ব্যাক্তি ও স্থানীয় গবেষকরা বলেন, নীল চাষে ইংরেজ নীলকর সাহেবদের মধ্যে যাদের নাম জানা যায় তাদের মধ্যে কুরীয়াল টিসি চুইডি, সিনোলব ম্যাকলিইড, ডাম্বল, ব্রীজবেন নিউ হাউজ সাহেবদের নাম উল্লেখযোগ্য। এসব নীলকর সাহেবরা রাজশাহী, ঝিনাইদহ, শিকারপুর, কেশবপুর এবং নাটোরের বাগাতিপাড়া এলাকায় জোর পূর্বকভাবে নীল চাষ করাতো। পরে ইংরেজদের নিকট থেকে ভারত ও পূর্ববাংলা ভাগাভাগীতে রেনুইক এন্ড কোং পূর্ব বাংলা এবং ভারতের সমস্ত কুঠিগুলির মধ্যে নওশেরা তথা পূর্ব বাংলার সমস্ত সম্পদ রফিক এন্ড কোং এর নামে হয়ে যায়। স্থানীয়দের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে, রফিক এন্ড কোং তার দখল-দারিত্ব পাওয়ার পর নাটোর চিনিকল স্থাপনের পরমুহুর্তেই রেনুইক কোং এর পক্ষ থেকে রফিক এন্ড কোং বাংলাদেশ সুগার কর্পোরেশনকে নওশেরা কলকুঠি ও কুঠিয়ালদের সকল সম্পত্তি দিয়েছেন। তারই ফলশ্রুতিতে সুগার কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকার বিশাল গাছ লুটপাটের মত কেটে নিয়েছে। কালের স্বাক্ষী হিসেবে পড়ে রয়েছে ইংরেজ সাহেবদের জন্য তৈরি নীলকুঠি নামে পরিচিত নওশেরা গ্রামের সেই ডাকবাংলো। এক সময়ের ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতনের স্মৃতি চিহ্ন অভিশপ্ত নীল কুঠিরের ডাকবাংলো অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। বিলীন হয়ে যেতে বসেছে ঐতিহাসিক এসব স্থাপনা।

কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা শতবর্ষী অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক নুর মোহম্মদ। তিনি বলেন, পারকুঠি ও নওশেরা গ্রামে ইংরেজরা নীলচাষের উপযোগী করে কুঠিবাড়ি স্থাপন করে। নীলকররা কুঠিবাড়ি স্থাপন করার পর ভারত উপমহাদেশ থেকে আদিবাসী ‘বাগদি’ সম্প্রদায়ের লোক এনে এখানকার জঙ্গল পরিস্কার করে। এছাড়া খাজনা আদায়ের জন্য আনা হয় পাঠান খানদের। পরে এসব জমির মালিকদের নীলচাষে বাধ্য করা হয়। যারা অসম্মতি জানাতো তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে ওই কুঠি বাড়িতে চাবুক পেটা করা হতো। নির্মম নির্যাতন করে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করা হতো। চাষকৃত নীল কেটে কুঠি বাড়িতে এনে পুকুরের পানিতে চুবিয়ে নীল তৈরী করা হয়। কিন্তু কৃষকদের ন্যায্য মুল্যও দেয়া হতো না। উপরুন্তু মাথায় কাদা মাখিয়ে চাবুক পেটা করা হতো।

নশেরা গ্রামের বাসিন্দা রনজিত সরকার বলেন, তার বাবা ইংরেজ নীলকর সাহেবদের এখানে ঘোড়া গাড়ির চালক হিসেবে কাজ করতেন। তিনিও দেখেছেন নীল চাষের জন্য কৃষকদের নির্যাতন করা হয়েছে এই কুঠিবাড়িতে ধরে এনে। ইংরেজদের পতনের পর পরে তার বাবা রেনুইক কোম্পাণীতে কাজ করেছেন।

নওশেরা গ্রামের বাসিন্দা সমাজসেবক আশরাফুল আলম খান ডাবলু এবং স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী মুক্তিযোদ্ধা রেজাউন্নবী ধংসপ্রায় ওই কুঠিবাড়ি সংস্কার সহ ইংরেজদের নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস সংরক্ষন করার দাবী করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা বলেন, নওশেরা গ্রামটিতে মুলত ব্রিটিশরা গেঁড়ে বসার জন্য আদিবাসী, পাঠান এবং খানদের এনেছিল। এছাড়াও এখানে ইংরেজদের আনা শ্রমিক গোষ্ঠী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বাগদী, সাঁওতালদের বংশধররা এ উপজেলায় বাস করে। সেসময় এখানকার চাষীদের দিয়ে জোরপুর্বক নীল চাষ করানো হতো। আর স্থাপনা গড়ে তুলেছিল নীল তৈরির জন্য পুকুর, কুঠিবাড়ি ও ডাকবাংলোসহ নানা স্থাপনা। এ সব স্থাপনা ইতিহাসের স্বার্থেই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। স্থাপনাগুলো সংস্কারের পাশাপাশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে ইতিহাস সংরক্ষনের জন্যও দাবী করেন তারা।

আরও খবর

  • ধামইরহাটে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা
  • আদালতে মিন্নির জামিন চেয়ে আবেদন
  • আম্মু নিচে গেছে ড্রেস আনতে
  • রাজশাহী নগরের ছেলেধরা সন্দেহে একজনকে গণপিটুনি
  • বগুড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে চারজনকে গণপিটুনি, পিকাআপে আগুন
  • প্রিয়া সাহাকে বহিস্কার
  • একসাথে হাঁটবে না বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট
  • ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে নিয়ে ধর্ষণ
  • ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন ২ নারীকে নির্যাতন
  • সুমনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন
  • গুজবে গণপিটুনি ঠেকাতে পুলিশকে কঠোর নির্দেশ
  • সিংড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে একজনকে পিটিয়ে পুলিশে সোপর্দ
  • মিন্নির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নয়ন বন্ডের মোটা অংকের টাকা
  • রাজশাহীতে ছেলেধরা সন্দেহে ৫ এনজিও কর্মীকে গণধোলাই
  • জিনের ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ও বলাৎকার করায় ইমাম আটক



  • উপরে