ধানের বাজার নিম্নমূখী লোকসানের শঙ্কায় কৃষক

ধানের বাজার নিম্নমূখী লোকসানের শঙ্কায় কৃষক

প্রকাশিত: ৩০-১১-২০১৯, সময়: ১২:২০ |
Share This

আসাদুজ্জামান মিঠু : বরেন্দ্র অঞ্চল জুড়ে পুরোদমে চলছে আমন কাটা-মাড়াই। ঘরে নতুন ধান উঠলেও দাম নিয়ে হতাশায় ভুগছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা। আমনের কাটা-মাড়ায়ের শুরুতেই সরকার আমনের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন ১০৪০ টাকা দরে। সরকারী ভাবে আমন কেনাও শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে।

তবুও সরকারের দেয়া দরের প্রভাব পড়ছেনা বাজারে। এক সপ্তহের ব্যবধানে বাজারে আবারো ধানের দাম নিম্নমূখী। এতে বড় লোকসারের শঙ্কায় করা হচ্ছে। সঙ্গে ক্ষোভ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে।

বর্তমানে বাজারে প্রতিমণ (৪০ কেজি ) ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৬০ থেকে ৫৮০ টাকা, যা সরকারে দেয়ার অর্ধেক দরে। এর এক সপ্তহ আগে ও প্রতিমণ ধান বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ৬৬০ থেকে ৬৮০ টাকায়। মাত্র কয়দিনের ব্যবধানে আবারো মণ প্রতি কমেছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।

বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রায় ৮০ ভাগ ধান ক্রয় করে থাকেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার মিল মালিকেরা। স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল-মালিকেরা ধান ক্রয় করতে যে দর বেধে দিচ্ছে সে দর দিয়ে কেনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

আর কৃষকেরা বলছেন, সরকারে দেয়া দর বাজারে কোন প্রভাব নেই। বর্তমানে যে দরে ধানের বাজার চলছে তাতে করে উৎপাদ খরচ তো উঠবেনা, বরং ঘর থেকে অন্য কিছু বিক্রি করে গচ্ছা দিয়ে মাহাজন পরিশোধ করতে হবে।

এর আগেও বোরো ধানের দাম মণ প্রতি ১০৪০ নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। তখনও সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকেরা সরকারে গোডাউনে ধান দিতে পারেনি। বাজারে দামও ছিল না। তাই ন্যায় মূল্য না পেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতিতে পড়তে হয়েছিল কৃষকদের।

কৃষকেরা জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে উচু-নিচু ক্ষেত প্রায় ৭০ ভাগ জমি বৃষ্টিপানির উপর নির্ভর করে আমন চাষাবাদ করে থাকে কৃষকেরা। আমনের মাঝামাঝি সময়ে পোকা আক্রমন দেখা দেয়। তাই অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে কৃষকদের দ্বিগুন খরচ হয়েছে। এখন ঘরে নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। ঘরে ধান উঠলেও পর্যপ্ত ফলন ও হচ্ছেনা। বাজানে নতুন ধানের দামও কয়েক বছরের তুলনায় সর্ব নিম্ন পর্যায়ে থাকায় দুশ্চিনন্তাই পড়েছে তারা।

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা জানান, প্রতি বিঘায় গড়ে ধান ফলন হচ্ছে কেজির মাপে ১২ থেকে ১৫ মণ করে। গত বছর হয়েছিল ১৮ থেকে ২০ মণ। বর্তমানে বাজারে ধানের দাম রয়েছে প্রতিমণ (৪০কেজি) ৫৬০ থেকে ৫৮০ টাকা পর্যন্ত। যা গত বছর এ সময় ধানের দাম ছিল প্রতিমণ(৪০কেজি) ৬৫০ থেকে ৬৮০ টাকা। তাদের হিসাবে গত বছরের চেয়ে চলতি মৌসুমে শুরু থেকেই ধানের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কম পাচ্ছেন। যা দিয়ে খরচের আসলটাই উঠবে কিনা সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আমনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৩৮৭ হেক্টর জমিতে। । এছাড়াও রাজশাহী অঞ্চলের,রাজশাহী,নঁওগা,নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমন চাষাবাদ হবে আরো ৩ লক্ষ্য ৫০ হাজার হেক্টরের উপরে।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের কৃষক আমজাদ আলী।অন্যেন ১৬ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চলতি মৌসুমে আমন চাষাবাদ করেছিলেন তিনি। মাঠে ধান ভাল থাকায় বুকে অনেক স্বপ্ন বেধেছিলেন তিনি। ৬ বিঘা জমির ধান কাটা-মাড়াই শেষ হয়েছে । সে হিসাব করে দেখেন তার বিঘাপ্রতি ১৪ মণ করে ফলন হয়েছে। আর মাহজনকেই দেয়া লাগবে প্রতি বিঘায় আট মণ ধান। যে টুকু থাকে বাজারে ধানের দরের যে অবস্থা তাতে বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারবো না। ঘর থেকে গচ্ছা দেয়া লাগবে।

গোদাগাড়ী উপজেলার চানন্দালায় গ্রামের কৃষক তসিকুল ইসলাম। চলতি বছর ২২ বিঘা জমিতে আমন চাষাবাদ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত তার ১২ বিঘা জমিতে ধান কাটা-মাড়াই শেষ হয়েছে। ফলন গড়ে ১৫ মণ করে হয়েছে।

কৃষক তসিকুল বলেন,চলতি বছর কীটনাশক প্রয়োগে আমন উৎপাদন খরচ বেশি হয়েছে। এমতেই ফলন কম হচ্ছে তার পরে বাজারে ধানের দান পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বৃহস্পতিবার এক আড়তে ২০ মণ ধান বিক্রি করেছেন। প্রতি মণ ৫৮০ টাকা দরে।
তিনি বলেন,এমন দাম বাজারে থাকলে অনেক লোকসান গুনতে হবে সকল কৃষকদের। তাই খুব দ্রত আমনের ন্যায় মূল্য যে কৃষকেরা পায় সে জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।

সরেজমিন বৃহস্পতিবার রাজশাহীর অঞ্চলের মধ্যে গোদাগাড়ী উপজেলার কাকন হাট ও শুক্রবার তানোর উপজেলার কালিগঞ্জ হাটেও নওগাঁর বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দেখা যায় হাটে নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। মাঠের ৬৫ থেকে ৭৫ ভাগ ধান কাটা-মাড়াই শেষ করেছেন কৃষকেরা। কাকন ও কালিগঞ্জ হাটে নতুন সুমন স্বর্না জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে মান ভেদে একমণ(৪০কেজি) ৫৯০ থেকে ৬০০ টাকায়।

তানোর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সমসের আলী জানান, সবে মাত্র আমনে মৌসুম শুরু হয়েছে। তাই ফলন কম হচ্ছে বলা যাবেনা। কারণ মাঠে কাটা অবস্থায় ধান রয়েছে ৪০ ভাগ। কৃষকেরা একটু ধর্য ধরে ধান বিক্রি করলে সরকারে নির্ধারিত মুল্য পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a comment

উপরে