সংরক্ষিত আলুতে হাজার কোটি টাকা লোকসানের শংকা

সংরক্ষিত আলুতে হাজার কোটি টাকা লোকসানের শংকা

প্রকাশিত: ২৩-০৯-২০১৯, সময়: ০০:১৩ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : হিমাগারে রক্ষিত আলুর দাম না থাকায় প্রায় হাজার কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে শুধুমাত্র রাজশাহীর চাষি ও ব্যবসায়ীদের। এরইমধ্যে অনেক চাষি ও ব্যবসায়ী ধার দেনা না করার লজ্জায় দিতে গা-ঢাকা দিয়েছে। লোকসানের ধকল সইতে না পেরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আবার অনেকে হিমাগারে আলু রেখে সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসেছে। এ অবস্থায় আগামীতে আগ্রহ হারাবে আলু সংশ্লিষ্টরা।

এবারে রাজশাহী জেলায় ৩২টি হিমাগারে প্রায় ৬২ লাখ বস্তা আলু সংরক্ষণ করে চাষি ও ব্যবসায়ীরা। যার মধ্যে লোকসান গুনে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩১ লাখ বস্তা। বর্তমানে এসব হিমাগারে আরো ৩১ লাখ বস্তা আলু রক্ষিত আছে (প্রতি বস্তায় নুন্যতম ৬০ কেজি)। হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রতি কেজি উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৩ টাকার ওপরে। বর্তমানে কাঁচা আলু প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১০ টাকা। এতে কেজিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে নুন্যতম আড়াই টাকা। আর প্রতিবস্তায় লোকসান হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা।

হিমাগার খোলার চার মাসে বিক্রি হয়েছে রক্ষিত আলুর অর্ধেক। সামনে আছে আর মাত্র সবোর্চ্চ দুই মাস। এই দুই মাসেই হিমাগারে রক্ষিত আলু বিক্রি করতে হবে। নইলে আলু হিমাগারে পচতে থাকবে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় চলতি ২০১৮-২০১৯ কৃষিবর্ষে আলুচাষ হয় ৩৮ হাজার ৯৭১ হেক্টর।

আলুতে যেমন ব্যাপক লাভ, তেমনি লোকসানের খতিয়ানও কম নয়। অনেকে কোটিপতি বনে যাচ্ছেন। আবার অনেকে লোকসানের ভার সইতে না পেরে এলাকা ছেড়েছেন। প্রকৃতি ও ভাগ্যের ওপরেই নির্ভর করে আলুতে লাভ-লোকসান। রাজশাহী জেলার ধানের পরেই ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে আলু। এখন সময় এসেছে সরকারিভাবে এই অর্থকরি ফসলের দাম নির্ধারণের-কথাগুলো বললেন মৌগাছী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফজলুর রহমান।

আলু রাজশাহীর অর্থকরী ফসল। ধানের পরেই ব্যাপকভাবে আলুর আবাদ হয়ে থাকে। এবছর লাভ হলে আগামী বছর লোকসান। লাভ লোকসানের দুরাচলের মধ্যে দিয়েই আশায় বুকবেধে আলুর আবাদ করে চলেছেন চাষিরা। গেলো কয়েক বছর ধরেই আলুতে লোকসান গুনছেন রাজশাহী অঞ্চলের চাষি। তারপরও বরেন্দ্রখ্যাত এই অঞ্চলে আলুচাষের পরিধি ও উৎপাদন বেড়েছে। পরপর তিন বছর থেকে থেকেই আলুতে লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। ফলে বিভিন্ন হিমাগার থেকে নেয়া ঋনের বোঝা বেড়েই চলেছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের।

চাষিদের ভাষ্য, আলুতে যেমন ব্যাপক লাভ, তেমনি লোকসানের ধ্বসও কম নয়। আলুর আবাদে কারো কারো ভাগ্যে বৃহস্পতি দেখা দিলেও অনেকের ভাগ্যে জুটেছে মৃত্যু। বর্তমানে আলুর আবাদের উৎপাদন খরচ বেশী হওয়ায় এখন আর এই আবাদ প্রান্তিক চাষিদের নেই। এখন চাষি কাম ব্যবসায়ীরাই আলুর আবাদ করছেন। লাভ লোকসান মাথায় নিয়ে প্রতিবছরই লাভের আশায় চাষে নামেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাষি বলেন, হিমাগারে আলু রেখে লোকসানের বোঝা সইতে না পেরে মোহনপুর উপজেলার ধুরইল গ্রামের জয়নাল আবেদীন নামের এক চাষির মৃত্যু হয়েছে।

জেলার মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের নুড়িয়াক্ষেত্র এলাকার বাণিজ্যিক আলু চাষি মোবারক হোসেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে বাণিজ্যিক আলুচাষ করছেন তিনি। এবার ৫০ বিঘা জমিতে আলুচাষ করে উৎপাদিত আলু হিমাগারে রেখেছিলেন আলু বিক্রির মৌসুমের শুরুতেই তিনি আলু বিক্রি করে দেন। এতে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। মোহনপুর উপজেলার সফল আলু চাষি কাম ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের এখনো হিমাগারে অবিক্রিত আলু রক্ষিত আছে প্রায় ১১হাজার বস্তা। বর্তমান বাজারে এতে বিক্রি করলে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হবে বলে জানান তিনি।

এই চাষি জানান, প্রতিবিঘায় আলু উৎপাদন হয় প্রায় ৪ টন। সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার। বর্তমান দামে আলু বিক্রিতে চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। তিন বছর আগে আলুচাষ করে পুঁজি হারিয়েছে। গত বছর উঠেছে উৎপাদন খরচ। এবার লাভের আশা দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু আলুতে গুড়েবালি।

রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত আলুচাষী জেলার পবা উপজেলার বড়গাছি এলাকার রহিমুদ্দিন সরকার বলেন, কয়েক বছর ধরেই রাজশাহীতে আলুচাষের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে। তাছাড়া উন্নত মানের আলুবীজ ব্যবহার করছেন চাষিরা। আর এতেই বাম্পার ফলন মিলছে। তবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের অভাবে আলুর নায্য দাম পাচ্ছেননা চাষিরা। তাছাড়া আলু রপ্তানীর উদ্যোগ নিলেও লোকসান কমতো কৃষকের।

রাজশাহী জেলা হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান লোকসানের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এবারে একদিকে বেশী জমিতে আলুচাষ হয়েছে এবং অন্যদিকে উৎপাদনও ভাল হয়েছে। দেশের অনেক জেলাতেই আলুর আবাদ হওয়ায় রাজশাহীর চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। চাষিরা দাম না পেলে আমাদের দুঃশ্চিন্তাও বেড়ে যায়। কারণ তাদের সাথে প্রতিটি হিমাগার কর্তৃপক্ষের লেন-দেনের বিষয়টি জড়িয়ে আছে। তিনি আরো বলেন, ভাল ও বড় চাষিদের আগামীতে আলু চাষ করার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করবেন তিনি।

রাজশাহী জেলা হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ¦ আবু বাক্কার আলী জানিয়েছেন, মোট উৎপাদিত আলুর প্রায় ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ হয় হিমাগারে। জেলায় ৩২টা হিমাগারের প্রত্যেকটিতে গড়ে ১৫ হাজার টন করে প্রায় সোয়া ৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা যায়। বস্তা হিসেবে ধরলে প্রায় ৩২ লাখ বস্তা।

লোকসানের বিষয়টি স্বীকার করে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, এই অঞ্চলের মাটি আলু চাষের উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আধুনিক চাষের কলাকৌশল নিয়ে কৃষকদের পাশে রয়েছেন সবসময়। তিনি বলেন বাজার মনিটরিং এর দায়িত্ব তাদের নয়। তবে কৃষকরা কোন আবাদে লোকসান গুনলে সেই আবাদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে বলেন ওই কর্মকর্তা।

উপরে