নকল ও ভেজাল কীটনাশকে সয়লাব বরেন্দ্র অঞ্চল

নকল ও ভেজাল কীটনাশকে সয়লাব বরেন্দ্র অঞ্চল

প্রকাশিত: ০৭-০৯-২০১৯, সময়: ২২:২০ |
Share This

আসাদুজ্জামান মিঠু : বরেন্দ্র অঞ্চলে চলছে আমনের ভরা মৌসুম। ক্ষেতের ফসলে রোগ-বালাই দমনে নানা পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম কীটনাশক। ফসলের মোট খরচের বেশি অর্ধেকটাই যাই কীটনাশক প্রয়োগে। কষ্টের ফসল রক্ষায় বাড়িতে থাকা প্রয়োজনী জিনিস বিক্রি করে হলেও কীটনাশক প্রয়োগ করেন কৃষকেরা। বর্তমানে বাজারে বেশির ভাগ কীটনাশক প্রয়োগ করে পোকা দমন হচ্ছে বলে কৃষকদের অভিযোগ।

কীটনাশক উৎপাদনকারী বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানী নকল ব্র্যান্ডের কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে অবাধে। এতে শুধু যে কৃষক ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে তা নয়, সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল রাজস্ব থেকে। মূলত বাজারে তুলনামূলকভাবে দাম কিছুটা কম ও মোড়ক দেখে আসল না নকল চেনতে না পারাই কীটনাশকের কেনে থাকেন কৃষকেরা। যার ফলে রাজশাহী অঞ্চলের বাজার এখন ভেজাল কীটনাশকের ব্যবস্যা রমরমা।

তবে মাঠ পর্যায়ের একাধিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বীকার করছেন, কোম্পানীর কর্তৃতপত্র ছাড়াই যততত্র কীটনাশক বিক্রি করছেন অনেক অসাধু ডিলার। আর ভেজাল ও নকল কীটনাশক গুলো পরীক্ষা করা ল্যাব উপজেলা পর্যায়ে না থাকায় সহজে ধরা যাচ্ছে না বলে তারা দাবি করেছেন।

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, সিনজেন্টা,অটো,ইমাগ্রীনসহ,দেশের নামিদামি কীটনাশ কোম্পানী ব্যান্ডের মোড়কে এসব ভেজার কীটনাশক দেদারসে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব ভেজাল কীটনাশক চেনার কোন উপায় থাকেনা কৃষকের। তারা ক্ষেতে প্রয়োগ করে পোকা দমন হচ্ছে না। যার কারণে কৃষকেরা আর্থিক ভাবে ক্ষতির মধ্যে পড়ছে।

এসব বিষয়ের কথা হয় একাধিক লাইন্সেস প্রাপ্ত কীটনাশক ডিলার যারা দেশের প্রতিষ্ঠিত কীটনাশক কোম্পানীর কর্তৃতপত্র নিয়ে ব্যবস্যা করছেন। তারা বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত কীটনাশক কোম্পানীর মোড়কে নকল ও ভেজাল কীটনাশকের অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছে। এসব নকল ও ভেজাল কীটনাশক চেনার কোনো উপায় নেই। ফলে কৃষকরা নকল ও ভেজাল কীটনাশক ব্যবহার করলেও জমিতে পোকামাকড় ও বালাই দমনে তা কোনো কাজে আসছে না।

তবে এর জন্য স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা দায়ী করে একাধিক কোম্পানীর কর্তৃতপত্র নিয়ে ব্যবসা করেন এমন ডিলারেরা জানান,কৃষি অফিসের কীটনাশক লাইন্সেস ১৬ টি শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো লাইন্সেস প্রাপ্ত ডিলারেরা সরকারী অনমোদিত কোম্পানীর কর্তৃতপত্র ছাড়া কীটনাশক বিক্রি করতে পারবেনা। আর যদি কেউ শর্ত ভঙ্গ করে তবে তার লাইন্সেস বাতিল বলে গন্যহবে। কিন্ত এমন শর্ত মানছেনা স্বাথ্যনেষি ডিলারেরা। তারা কোম্পানীর কর্তৃতপত্র ছাড়াই বেশি লাভের আশায় নকল ও ভেজার কীটনাশক বিক্রিতে উৎসাহ হচ্ছে। আর এসব দোকানীর কাছে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন কৃষি কর্মকর্তারা।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা এলাকায় প্রায় অর্ধশত কৃষক নকল কীটনাশক কেনে প্রতারিত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পৌর এলাকার ময়েনপুর আঠারো কুড়া গ্রামের ইউসুফ আলী ও বাধাইড় ইউপির হরিশপুর গ্রামের আনারুল ইসলাম নামের দুইজন প্রতারিত কৃষকের সাথে কথা হয়।

কৃষক আনারুল বলেন,তার আমন ক্ষেতে মাজরা পোকার আক্রমণ দেয়া দেয়। মুণ্ডুমালা বাজারে একটি দোকান থেকে অটো কোম্পানীর নাইট্রো নামের একটি কীটনাশক বোতল দেন। তার গায়ে ৭৩০ টাকা মুল্য থাকলেও দোকানী মাত্র ৩৩০ টাকায় ধরিয়ে দেন। কম দামে পাওয়া নিয়ে গিয়ে ক্ষেতে প্রয়োগ করি। কিন্ত মাজরা কোন প্রকার দমন করতে পারিনি। পরে অটো কোম্পানীর একজন ডিলারের কাছে খালি বোতল নিয়ে গিয়ে অভিযোগ জানায়। তারা বলেন, ৩৩০ টাকা দিয়ে কেনা নাইট্রো নকল। যে দোকানে এটি নিয়েছেন সে দোকানে অটো কোম্পানীর কর্তৃতপত্র নাই।

কৃষক ইউসুফ আলী বলেন, এক সপ্তহ আগে মুণ্ডুমালা বাজারে সিনজেন্টার ডিলার নয়,এমন এক কীটনাশক দোকানে গিয়ে আমনে পচনের জন্য কীটনাশক চান। দোকানীরা সিনজেন্টার ইমেষ্টারটপ বড় বোতল ধরিয়ে দেন। বোতলে গায়ে ১৬৫০/-টাকা দর দেয়া ছিল। তারা সাড়ে চারশ টাকা কমে ১২০০/টাকা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষেতে প্রয়োগ করে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কোন প্রতিকার পাওয়া যাইনি।

এমন প্রতারণা স্বীকার শুধু তানোর উপজেলার কৃষকেরাই নয়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, মোহপুর, বাগমারা, দুর্গাপুরসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের হাজারা হাজার কৃষক এসব ভেজার ও নকল কীটনাশক কেনে প্রতিনিয়ত ঠকছে।

তানোর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সমশের আলী, বাজারে নকল ও ভেজার কীটনাশক পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এসব ভেজার কীটনাশক গুলো পরীক্ষা করা কোন ল্যাব উপজেলা পর্যায়ে নেই। এমন ভাবে এগুলো প্যাকেটজাত হয়ে থাকে, ব্যান্ডের মোড়ক দেখে চেনার উপায় থাকে না এগুলো নকল না আসল। তবে কৃষকেরা এসব কীটনাশক ব্যাবহার করে কোন কাজে আসছেনা বলে ভরি ভরি অভিযোগ রয়েছে। আমরা বিষয়গুলো উর্দ্ধত কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়েছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে ভেজাল ও নকল কীটনাশক ও বীজ পাওয়া যাচ্ছে। এমন সংবাদে সম্প্রতি গোদাগাড়ী এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। তাতে একটি কীটনাশক দোকানে ভেজার কীটনাশক ও বীজ পাওয়া তাকে ১০ হাজার টাকা জরিপনা করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

উপরে