সোনালী আঁশে ব্যস্ত চাষিরা

সোনালী আঁশে ব্যস্ত চাষিরা

প্রকাশিত: ২২-০৭-২০১৯, সময়: ১৯:০৯ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : পাট চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। পুরো জেলাজুড়েই চলছে পাট কাটা, জাগ দেয়া, আঁশ ছড়ানো ও শুকানো। দাম মোটামুটি ভাল থাকায় এবারে চাষিদের লাভের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এবারে ঈদুল আযহার কোরবানি ও নানা কেটাকাটা সহজ হবে বলে জানিয়েছেন পাট চাষিরা। তবে দেশের অন্যান্য স্থানে বাজারে পাট উঠলেও রাজশাহীতে নতুন পাট পেতে আরো কয়েকদিন লাগবে।

ভালো দাম ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার রাজশাহীতে পাটের আবাদ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বিঘা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন সোনালী আঁশের সু-দিন ফিরতে শুরু করেছে। অনুকুল আবহাওয়ায় ভাল ফলনের আশা করছেন চাষি ও কৃষিবিদরা। প্রতিমণ পাট (৪০ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ১৮শ’ টাকা থেকে দুই হাজার।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, এবারে জেলার বিভিন্ন উপজেলাতে লক্ষমাত্রার বেশী জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। আর গতবারের চেয়ে এক হাজার ২১ হেক্টর (সাত হাজার ৬শ’ বিঘা) বেশী জমিতে আবাদ হয়েছে। গতবার আবাদ হয়েছিল ১২ হাজার ৮২৫ হেক্টর। এবারে হয়েছে ১৩ হাজার ৮৪৬ হেক্টর। এবারে লক্ষমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৫৭৫ হেক্টর। এবারে উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার ৫৭৭ বেল (১ বেল সমান প্রায় ৫ মণ বা প্রায় ১৮৭ কেজি)।

পাট চাষি ও কৃষিবিদদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারী ভাবে খাদ্যশস্যে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক ঘোষনাসহ পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় কদর বেড়েছে পাটের। গত ২ বছর যাবত ভাল দাম পাওয়ায় রাজশাহী অঞ্চলে পাটের সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। রাজশাহীতে বৃদ্ধি পেয়েছে পাটের আবাদ। এই জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে রাজশাহীতে বেসরকারি পর্যায়ে নির্মিত কয়েকটি জুটমিল।

এবারও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চলতি খরিপ-১ মৌসুমে রাজশাহীতে ভালো বৃষ্টিপাত হয়েছে। দফায় দফায় বৃষ্টির কারনে এবারও পাটের ভাল উৎপাদনের আশা করছেন চাষিরা। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ার পরেও দাম ভাল থাকায় লাভ হয়েছে। তাদের হিসাব মতে পাটের আবাদ করতে বিঘায় সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাট উৎপাদন হয়েছে বিঘায় ৮ থেকে ১২ মন। গতবার মৌসুমের শুরু থেকেই পাটের দাম ভাল ছিল। প্রতিমণ পাট (৪০ কেজি) বিক্রি হয় ১৭শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা। মৌসুমের শেষের দিকে প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে ১৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকায়। চাষিরা মনে করেন, মধ্যসত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট না থাকলে পাটের দাম আরো বেশি হতো। চাষিরা পাটের নায্যমূল্য প্রাপ্তিতে উঠতি মৌসুমে দর নির্ধারনে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

প্রায় তিন বছর পরে গতবার দাম ভাল ছিল পাটের। পাট নিয়ে নানা চমক ও উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ নিলেও চাষি পর্যায়ে দাম না থাকায় পাটের আবাদ কমেছিল। গত মৌসুমে পাটের দাম অনেকটাই ভাল ছিল। প্রেক্ষিতে এবারে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আবাদ বেশী হয়েছে।

জিনোম আবিষ্কার, পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে সরকারি প্রণোদনা এবং সর্বশেষ পাট থেকে পলিথিন আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু এসব সত্বেও শুধুমাত্র কাংখিত বাজার মূল্য না পাওয়ায় তুলনামূলকভাবে পাটচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন চাষিরা। সোনালী আঁশের এ দেশে পাটচাষ আশানুরুপ নয় বলে দাবি করেছেন অভিজ্ঞজনেরা।

জেলার পবা, মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর উপজেলায় পাটের আবাদ ভাল হয়েছে। সরোজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পাটকাটা, জাগ দেয়া, আঁশ ছড়ানো এবং শুকানো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষি ও তার পরিবার। কোথাও কোথাও ক্ষেতে পাট গাছ কাটছে, কোথাও জাগ দেয়ার জন্য পাটের আঁটি সংরক্ষণ করছে। আবার কোথাও আঁশ ছড়াচ্ছে এবং গৃহবধূরা পাট শুকাচ্ছেন। দাম ভাল থাকায় নতুন স্বপ্ন বুনেছেন চাষিরা। অন্য বছরের তুলনায় এবার পাটের দাম বেশি হবে এমন ভবিষ্যৎ স্বপ্ন পূরণে আশার আলো দেখছেন তারা।

পাট ব্যবসায়ী ও নওহাটা মিলস’র মালিক মনসুর বলেন, ‘গতবার থেকে পাটের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। নওহাটা বাজারে আজকে নতুন পাট উঠতে পারে। দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যক্তি উদ্যোগে জুটমিল গড়ে উঠায় চাষিরা পাটের দাম ভাল পাচ্ছেন। এবারো দাম ভাল পাবেন’। তিনি বলেন, ‘এ এলাকার পাটের মান ভালো করলে চাষিরা আরো বেশী দাম পাবে। আজকে প্রতিমণ পাট ক্রয় হবে ১৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকায়’।

দেশে আদমজি জুটমিলসহ বড় বড় জুটমিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবার পরে চাষিরা কয়েক বছর শুধুমাত্র শাক ও গৃহস্থালী কাজের জন্য পাটচাষ করতেন। ওই অবস্থায় জেলায় ২০০১ সালে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট ছোট পাটকল স্থাপনের পরে আবারো পাটচাষের পরিধি বাড়তে থাকে। ২০১১ সালে সেখানে জেলায় ১৪ হাজার ২০২ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল।

পাটের দাম পড়ে যাওয়ায় এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আবারো পাট চাষ কমতে থাকে। ২০১২ সালে পাটচাষ হয়েছে ১৩ হাজার ৫১৪ হেক্টর। ২০১৩ সালে ১২ হাজার ১০১ হেক্টর এবং পরের বছরে মৌসুমে আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ৯৪৫ হেক্টর জমিতে। গতবার আবাদ হয়েছে ১২ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে। এবারে আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৪৬ হক্টের।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ উপ-পরিচালক সামছুল হক বলেন, এবারে পাটচাষের অনুকুল আবহাওয়া বিরাজ করায় আবাদ ভাল হয়েছে। উৎপাদনও ভাল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। দাম ভাল পেলে আবারো পাটের সুদিন ফিরবে ও সোনালী আঁশের মর্যদা বাড়বে। লাভবান হবেন চাষিরা। আগামীতে চাষ হবে আরো বেশী।

উপরে