রাজশাহীতে বাড়ছে ‘লাইভ পার্চিং’

রাজশাহীতে বাড়ছে ‘লাইভ পার্চিং’

প্রকাশিত: ০৭-১০-২০১৮, সময়: ২১:০৪ |
খবর > কৃষি
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে প্রাকৃতিক উপায়ে ‘লাইভ পার্চিং ও আলোর ফাঁদ এবং সেক্স ফেরোমন ফাঁদ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। ফসলের মাঠে এটির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধীরে ধীরে কৃষকরা এদিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফসলের জমিতে ক্ষতিকারক পোকা-বালাই দমনের পাশাপাশি মাটি’র নাইট্রোজেনের ঘাটতিও পূরণ হচ্ছে। এতে একদিকে ফসলে কীটনাশক স্প্রে’র বাড়তি খরচ কমেছে এবং অন্যদিকে বাড়ছে ফসলের উৎপাদনও। ফসল থাকছে রাসায়নিক বিষমুক্ত।

পার্চিং একটি ইংরেজী শব্দ। ফসলের জমিতে ডাল, কঞ্চি, বাশের খুঁটি এগুলো পুতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে পাখি ক্ষতিকারক পোকার মথ, বাচ্চা, ডিম খেয়ে পোকা দমন করে। পোকা দমনের এই পদ্ধতিকে পার্চিং বলা হয়ে থাকে । ফসলের পোকা দমনের এই পদ্ধতি অত্যান্ত কম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশবান্ধব। পার্সিং দুই প্রকার হতে পারে ডেড পার্সিং ও লাইভ পার্সিং। মরা ডালপালা পুতেঁ দিলে তা হবে ডেড পার্সিং এবং ধইঞ্চা, কলা গাছ জীবন্ত পুতেঁ দিলে তা হবে লাইভ পার্সিং। তবে রাজশাহীতে ‘লাইভ পার্চিং’ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও আলোর ফাঁদ ও ফেরোমন ব্যবহার করেও ক্ষতিকর পোকা দমন করা হচ্ছে।

মাঠ জুড়ে এখন কাঁচথোড় (শীষ বের হওয়ার আগে) আমন ক্ষেতে সবুজের সমারোহ। চলতি মৌসুমের রোপা আমন ধানের ক্ষতিকর পোকা নিধনে বিষের (বহুজাতিক কোম্পানীর রাসায়নিক কীটনাশক) বিকল্প হিসেবে কৃষক ক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতি হিসাবে জীবন্ত ধঞ্চেগাছ-ডালপালা ও আলোর ফাঁদ এবং সেক্স ফেরোমন ফাঁদ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ধান ক্ষেতের আইলে কোথাও পানি ভর্তি পাত্রে, কোথাও কাগজের উপড় আলো জ্বেলে ধানে আক্রমণাত্মক বিভিন্ন পোকা ধরা হচ্ছে। কৃষকরা নিজেই জমিতে এই পোকাগুলোর পরিমাণ দেখে ক্ষেতে পোকার আক্রমণের আগেই কোন ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে তা খুব সহজেই নির্ধারণ করতে পারছেন।

কৃষকরা জানায় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্ততর কর্তৃক এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের পর সফলতা আসায় ধান ক্ষেতে এসব পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। ধান ক্ষেতের প্রধান শক্র কারেন্ট, মাজরা, গান্ধি ও চুঙ্গি পোকাসহ বাদামী ঘাস ফড়িং নিধনে জমিতে পাচিং ও আলোক ফাঁদ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, পার্চিং ও আলোক ফাঁদ ব্যবহারে পরিবেশ ভাল থাকে, উৎপাদন খরচ কম হয়, কীটনাশক কম লাগে এবং বিপিএইচের উপস্থিতি সহজে বোঝা যায়। আলো দেখলে বাদামী গাছ ফড়িং বা বিপিএইচ পোকা ছুটে এসে এক জায়গায় মিলিত হয়, ফলে সহজে এ পোকা ধ্বংস করা যায়। এতে করে এলাকার কৃষকগণ উপকারি ও অপকারি পোকা সহজে চিনতে পারছে। এছাড়াও এলাকার কৃষকেরা কোন পোকা দেখলেই কিটনাশক দিতে হবে এই ধারনা যে ভুল তা সহজেই বুঝতে পারছে। তারা পরিবেশ বান্ধব পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করে পোকা দমনের দিকে ঝুকছে।

পার্চিং সাধারনত জীবন্ত ও মৃত এই দুই ধরনের হয়ে থাকে। আমন খেতে ধইঞ্চার গাছের জীবন্ত পার্চিং এবং বিভিন্ন ডাল দিয়ে মৃত পার্চিং তৈরি করা হয়। পার্চিং আইল থেকে বেশ দূরে দেয়ায় ভালো এবং জমির যে অংশে চলাচলের অসুবিধা আছে সেখানে স্থাপন করা ভালো। পার্চিং টিকে চুনের দ্রবণে চুবালে অনেকটা ধবধবে সাদা দেখাবে এবং ক্ষেতের অনেক দূর থেকে দৃষ্টিগোচরে আসবে। চুনের পরিবর্তে সাদা পেইন্ট দিয়েও পার্চিংয়ের ওপরের অংশকে রঙ করা যাবে। আর মাটিতে পুতার অংশে আলকাতরা দিয়ে লেপে দিলে খুঁটির স্থায়িত্ব বেশি হয়। আমন খেতে পার্চিং করে পাখি বসানোর ব্যবস্থা করা হয়। এখানে পাখি বসে ফসলের পোকামাকড় ধরে খেয়ে ফেলে। এভাবে পোকা দমনে বালাইনাশক ব্যবহার না করায় পরিবেশের কোন ক্ষতি হচ্ছেনা।

জেলার মোহনপুর উপজেলার খয়রা মাটিকাটা গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার জানান, তিনি দেড় বিঘা জমিতে রোপা আমন আবাদ করেছেন। এই জমিতে তিনি ৮টি ধইঞ্চা গাছ লাগানোর ফলে পোকামাকড়ের উপদ্রব অনেকটাই কমে গেছে। শুরুতে একবার কীটনাশক স্প্রে করার পর আর করতে হয়নি। ব্যবহার করেননি ইউরিয়া সারও।

পবা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা একেএম মনজুরে মাওলা জানান, পার্চিং পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই ছিল। আমাদের দেশের কৃষকরাই অস্বীকৃত বড় কৃষিবিদ। ক্ষতিকর পোকার আক্রমন থেকে ধান বাঁচাতে তারা পাচিং করতো। বর্তমানে লাইভ পার্চিং ভাল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। চলতি রোপা আমন মৌসুমে পবায় পার্চিং পদ্ধতি দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কৃষকদের মধ্যে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে আফ্রিকান ধইঞ্চা গাছ দারুণভাবে উপকার করছে জমির ক্ষেতে। ধইঞ্চার পুরো গাছে নুডুল রয়েছে। যা বায়ুমন্ডল থেকে নাটট্রোজেন গ্রহণ করে, ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। ফলে ইউরিয়া সার কম লাগে। গত দু’বছর থেকে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আগামীতে পুরো উপজেলায় ‘লাইভ পার্চিং-এ আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক দেব দুলাল ঢালি বলেন, আমন খেতের ক্ষতিকর বিপিএইচসহ অন্যান্য পোকা দমনে পরিবেশ বান্ধব পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য চাষিদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন এলাকায় কৃষক সমাবেশ ও মাঠ দিবস করা হয়েছে। ফলে রাজশাহীতে বেড়েছে পার্চিংয়ের ব্যবহার। এছাড়া বিভিন্ন ব্লকে আলোক ফাঁদ করা হচ্ছে।

এছাড়াও এই ‘লাইভ পার্চিং’ এর ব্যবহারের ফলে ফসল কাটার পর কৃষক পাচ্ছে, বাড়তি জ্বালানির চাহিদা। সেই সাথে বাড়ছে, ফসলের উৎপাদনও। ‘লাইফ পার্চিং’ এর ব্যবহার বাড়াতে ও কৃষকদের উদ্ভুদ্ধ করতে কাজ করছে কৃষি বিভাগসহ বিএডিসি। ‘লাইফ পার্চিং’ পরিবেশ বান্ধব যুতসই একটি সোনাতন পদক্ষেপ।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এবার রাজশাহীতে আমন চাষের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭১ হাজার ৩৩৭ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ৭৩ হাজার ৭৫০ হেক্টরে। এই আবাদের শতকরা ৮৫ ভাগ জমিতে পোকা দমনে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার মধ্যে শতকরা ৪২ ভাগ জীবন্ত এবং ৪৩ ভাগ মৃত পার্চিং। শতভাগ জমিতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।

Leave a comment

আরও খবর

  • মৎস্য খাতে শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্য
  • স্বস্তির বৃষ্টিতে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের মুখে হাসি
  • পুঠিয়া-চারঘাটে কৃষকের ভাগ্য ফেরাতে স্বপ্ন দেখাচ্ছে সোলার পাম্প
  • সঠিক নিয়মে উন্নত পদ্ধতিতে পেঁপে চাষ
  • চলতি মৌসুমে ১০ কোটি টাকার গুড় বিক্রির টার্গেট
  • রাজশাহীতে বাড়ছে ‘লাইভ পার্চিং’
  • পুঠিয়ায় প্রদর্শনীর কৃষকদের সার কম দেওয়ার অভিযোগ
  • বরেন্দ্র অঞ্চলে খরার কবলে আমন
  • কৃষিঋণ বিতরণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি
  • পত্নীতলায় বেড়েছে আমনের আবাদ, বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা
  • আগাম মূলা চাষে কৃষকের হাসি
  • মান্দায় ব্রি-ধান ৭২ এর কৃষক প্রশিক্ষণ
  • শিবগঞ্জে আমন ফসলে সবুজের সমারোহ
  • শীত না এলেও সবজি বাজারে
  • বাগাতিপাড়ায় পোকা মারতে আলোক ফাঁদ


  • উপরে